
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নিউ ইয়র্ক আর্চডায়োসিস যাজকীয় যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সাথে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে যাজক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার এক হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সাথে এই সমঝোতা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটাবে। শত শত ব্যক্তি যাজক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। বাদিদের একজন আইনজীবী এ তথ্য জানিয়েছেন।
এই সমঝোতা দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটাবে এবং একই সাথে আর্চডায়োসিসের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইনজীবী পল মোনেস, যিনি কয়েকজন বাদির প্রতিনিধিত্ব করছেন, তিনি জানান যে যদিও চূড়ান্ত চুক্তিটি এখনো সম্পন্ন হয়নি, তবে কেবল কয়েকটি ছোটখাটো বিষয় বাকি রয়েছে।
শনিবার এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মোনেস বলেন, ‘এটি ভুক্তভোগীদের জন্য একটি পরিসমাপ্তি নিয়ে আসে- যাদের অনেকের বয়সই এখন ৬০, ৭০ এমনকি ৮০ বছরের কোঠায়। এটি মানসিকভাবে অতীতের অধ্যায়টি বন্ধ করার (বা অন্তত চেষ্টা করার) ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবুও যারা ভয়াবহ অবিচারের শিকার হয়েছিলেন, তাদের জন্য এটি অন্তত কিছুটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।’
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে নিউ ইয়র্ক স্টেট কোর্ট অব আপিলস ১৯৬০, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ক্যাথলিক যাজকদের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘স্ট্যাটিউট অব লিমিটেশনস’ (মামলা দায়েরের সময়সীমা সংক্রান্ত আইন) শিথিল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
পরবর্তীতে, ২০১৯ সালে অঙ্গরাজ্যটিতে ‘চাইল্ড ভিকটিমস অ্যাক্ট’ (শিশু ভুক্তভোগী আইন) পাস করা হয়। এই আইনের ফলে যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করার সুযোগ পান। এরপর হাজার হাজার মানুষ আর্চডায়োসিস, বয় স্কাউটস এবং জেফরি এপস্টেইনসহ আরো অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
এরপর, নিউ ইয়র্ক আর্চডায়োসিস যাজকীয় নির্যাতনের শিকার এক হাজার ৩০০ ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। নিউ ইয়র্কের রোমান ক্যাথলিক ডায়োসিস এই দাবিগুলো নিষ্পত্তির জন্য নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে এবং ব্যয় সঙ্কোচন করে। উল্লেখ্য, একই ধরনের কেলেঙ্কারির মুখে নিউ অরলিন্সের আর্চডায়োসিস দেউলিয়া ঘোষণা করেছিল। মোনস ব্যাখ্যা করেছেন যে, নিউ ইয়র্কের ভুক্তভোগীরা এখন দু’টি বিকল্পের যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন: হয় তারা আর্চডায়োসিসের (ধর্মপ্রদেশ) সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারেন, যেখানে প্রত্যেকে দুই লাখ ৫০ হাজার ডলার পাবেন; অথবা তারা একটি ফর্ম পূরণ করে বিস্তারিত জানাতে পারেন যে ঠিক কী ঘটেছিল। এরপর একটি বরাদ্দ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে যে, তারা ঠিক কত অর্থ পাবেন।
নিউ ইয়র্কের আর্চবিশপ রোনাল্ড এ. হিকস যাজকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি ইমেইলে লিখেছেন: ‘ঈশ্বরের কৃপায়, আমরা এখন সব ভুক্তভোগীর জীবনে কিছুটা নিরাময় ও পুনর্মিলন নিয়ে আসার দ্বারপ্রান্তে রয়েছি।’
এই সমঝোতার মাধ্যমে নিউ ইয়র্কের দাবিগুলোর নিষ্পত্তি হলেও, ক্যাথলিক চার্চকে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
‘ডব্লিউটিটিডব্লিউ নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিকাগোর আইনজীবীরা এই মাসে শহরের আর্চডায়োসিসের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, চার্চ কর্তৃপক্ষ জানত যে তাদের যাজকরা একটি প্যারিসে যৌন অপরাধের চক্র চালাচ্ছেন, কিন্তু তারা তা বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বাল্টিমোরেও আর্চডায়োসিস যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সাথে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। মোনস জানিয়েছেন যে, এই সমঝোতার ফলে আর্চডায়োসিস পুনরায় তার মূল লক্ষ্য- ধর্মবাণী প্রচার, অসুস্থদের সেবা, দরিদ্র ও অভাবী মানুষের যতœ নেয়া, আগত অতিথিদের স্বাগত জানানো এবং শিশুদের শিক্ষিত করে তোলার কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবে।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যৌন নির্যাতনের শিকার প্রত্যেকেই নিউ ইয়র্ক আর্চডায়োসিসের কাছ থেকে অন্তত দুই লাখ ৫০ হাজার ডলার পাবেন। নির্যাতনের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এই অর্থের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। এই সমঝোতাটি হলো এ ধরনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘটনা; এর আগে ২০২৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের আর্চডায়োসিস ৮৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে এক হাজারটিরও বেশি অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবী জেফ অ্যান্ডারসন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা তাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দৃঢ় সঙ্কল্পের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পথে একটি অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছেন।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








