
সরকার মাজহারুল মান্নান রংপুর ব্যুরো
রংপুরে অটোরিকশা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় গণপিটুনিতে মারা গেছে দুই যুবক। এ সময় চোরেরা করো কুপিয়ে জখম করে তিনজনকে। এ দিকে গঙ্গাচড়ার বাগপুর গ্রামে অটোসহ গরু ছাগল চুরির হিড়িকের কারণে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোর পৌনে ৬টার দিকে গংগাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের বাগপুর পানাপুকুর পুকুর খুলির দোলার তিস্তা সেচ ক্যানেলে এই ঘটনা ঘটে। নিহতদের নাম এজারুল মিয়া ওরফে কানা রেজাউল ও সাদিকুল ইসলাম। তাদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। অন্য দিকে আহত অটোরিকশার মালিক সোহেল মিয়া, স্থানীয় রাজমিস্ত্রি নাসির উদ্দিন ও তানজিমুল ইসলামকে গঙ্গাচড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তের উদ্ধৃতি দিয়ে গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আবদুস সবুর জানান, ভোরে বাগপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার আবদুল মতিনের ছেল সোহেল মিয়ার বাড়ি থেকে অটোরিকশা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় তাতে বাধা দেয় অটোটির মালিক সোহেলসহ স্থানীয় যুবক নাসির উদ্দিন, তানজিমুল, আবদুস ছাত্তার ও হারুন। এ সময় চোরেরা তাদেরকে প্লাস দিয়ে হাতে এবং মাথায় আঘাত করে নিজেরাই অটো চালিয়ে যেতে থাকে। পরে তানজিমুলের বাড়ির কাছে অটোটি উল্টেগেলে তা রেখেই দুই চোর পুকুর খুড়ির দোলার আমন ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড় দেয়।
মসজিদের মাইকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদেরকে চার গ্রামের মানুষ চতুর্দিক থেকে ধাওয়া করে। পরে তিস্তা সেচ ক্যানেলে উঠলে সেখানেই গণপিটুনি দেয় উত্তেজিত জনতা। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় তারা।
খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ। খবর দেয়া হয় অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ক্রাইম সিনকে। তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করেছে ক্রাইম সিন। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করে সুরুতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর থানায় নেয়া হয়। দুপুরে পাঠানো হয় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( এ সার্কেল) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান।
নিহত আজারুল মিয়া নোহালি ইউনিয়নের কচুয়া বাগদহারা গ্রামের ইন্তাজ আলীর ছেলে। অপরজন সাদিকুল ইসলাম কোলকোন্দ ইউনিয়নের দক্ষিণ কোলকন্দ গ্রামের আইয়ুব আলীর ছেলে। এই ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
সোহেলের বাড়ির ঠিক অপরপাশেই মসজিদ। ওই মসজিদের ঈমাম মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি মসজিদের বারান্দায় দাঁত পরিষ্কার করছি, এমন সময় দেখি অটো বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন অটোওয়ালা দৌড়ে অটোর সামনে আসে তখন আমিও দৌড় দেই এবং চিৎকার করি পরে লোকজন বের হয়। পরে আমরা নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষ করে সামনে এগিয়ে গিয়ে শুনি চোররা গণপিটুনিতে মারা গেছে।
প্রতক্ষ্যদর্শী বৃদ্ধ আলতাফ হোসেন বলেন, ‘নামাজ পড়তে মসজিদে ঢুকেছি ফজরের সুন্নত নামাজ পড়ছি, ফরজ পড়তে কাতারে দাঁড়ায়ছি এমন সময় সোহেল চিৎকার দিলে, মসজিদ থেকে বেরিয়ে দেখি তাকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে! এ সময় মসজিদের মাইকে চোর এসেছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। তারপর কি হয়েছে আমরা আর বলতে পারি না।’
বড়বিল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ সদস্য চাঁদ মিয়া জানান, ‘সকালবেলা আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি চিল্লাচিল্লি শুনি চোর বেড়াইছে চোর বেড়াইছে। অটো চুরি করে যাওয়ার সময় বড় কার্টিং প্লাসি দিয়ে দুইজনকে মারছে। আহত দুইজনের মধ্যে একজনের নাম নাছির আরেকজন তানজিমুল। মাইকের আওয়াজ শুনে ওকরা বাড়ি, গিলার পাড়, নগর বারী, বাগপুরের লোকজন একত্র হয়। অটোটি তানজিমুলের বাড়ির কাছে মোড় ঘুরতে পরে গেলে অটো রেখে চোর ধান ক্ষেত দিয়ে পালানোর সময় পুকুর খুড়ি পাতারে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে। সেখানে তাদেরকে পিটিয়ে মারে জনতা।
অটোরিকশা, গরু-ছাগল ভ্যান চুরির হিড়িক
বাগপুর গ্রামের বাসিন্দাস আবদুল আলিম বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রায় অটো ভ্যান চুরি হচ্ছে। কিছুদিন আগে দুইটা অটো চুরি হয়েছে। একটা ভ্যান বের করেছিল এলাকাবাসী সজাগ হলে সেই ভ্যান ছেড়ে চোর পালিয়ে যায়। তিনি আরো বলেন এক খেয়েছে মাদক আর এক খেয়েছে চোর। যারা মাদক খায় তারাই চোর। সাম্প্রতিক সময় এই এলাকায় পাঁচ-ছয়টি অটো ছিনতাই ও চুরি হয়েছে। চোরের খুব উপদ্রব বলে জানান তিনি।
বাগপুর দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা এনামুল হক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় চোরের উপদ্রব এর কারণে আমাদেরকে রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। গরু-ছাগল, অটো, ভ্যান, রিকশা নিয়ে আমরা খুব বিপাকে আছি। আমাদের এ দিকে থানা পুলিশও খুব গুরুত্ব দেয় না- আমরা খুব আতঙ্কে থাকি’।
দুই সন্তানকে নিয়ে হতাশায় সাদিকুলের স্ত্রী
সাদিকুলের বাড়ির দক্ষিণ কোলকোন্দ বাঁধের পাড়ে গিয়ে দেখা গেলে সাদিকুল ওই বাড়িতে থাকে না। একটি ঘর তা-ও এলোমেলো।
ওই গ্রামের বাসিন্দা রতন মিয়া বলেন, ‘গত পরশুদিন সাদিকুল এসেছিল ঘর বিক্রি করার জন্য। সে গত পাঁচ-ছয় মাস যাবৎ তার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় থাকে। গ্রামে ছোটখাটো চুরির সাথে জরিত সে, এর আগে ধানও চুরি করেছিল; কিন্তু এত বড় ধরনের কোনো কিছু আগে শুনি নাই। সাদিকুল কোনো সময় চায়ের দোকানে থাকত, কোনো সময় ঢাকায় থাকত বলেও জানান তিনি।’
শারমিন বেগম জানান, ‘আমার স্বামী ওই বাড়িতে তো থাকে না। ওখানে বাড়ি ঘরের সমস্যা, বাড়ির ঘর ঠিক করবে, তারপরে এখান থেকে আমরা যাবো। গতকাল আমাকে বলেছে কাজ-কাম নাই, আমি ঢাকা চলে যাই। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া তুমি এখানে থাক। আমি যে টাকা পাঠাই দিবো, তারপরে ঘর ঠিক করব। গতকাল (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাত-রুটি খেয়ে ঢাকায় যাবে বলে বাইরে গেছে। পরে ফোনে বলল- আবার এসেব্যাগ নিয়ে যাবে। কিন্তু আর এলো না। পরে শুনলাম সে আর দুনিয়াতে নাই। আমার দু’টি সন্তান নিয়ে আমি এখন কোথায় যাবো। আমি এর বিচার চাই। তারা আমার স্বামীকে না মেরে পুলিশে দিতে পারত।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ সার্কেল শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান জানান, ‘চোর সন্দেহে যাদেরকে গণপিটুনি দেয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলা ছিল। এর মধ্যে এজারুলের নামে ওয়ারেন্ট ছিল থানায়। তাদের মধ্যে একজন নোহালি আর একজনের কোলকোন্দ ইউনিয়নের বাসিন্দা। এ ব্যাপারে নিয়মিত হত্যামামলা হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এরই মধ্যে একটি অপমৃত্যুর জিডি হয়েছে। তার আলোকে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। ওই এলাকায় চুরির বিষয়ে কড়া নজরদারি করা হচ্ছে।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








