
নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের (ভিপিএসএসসি) গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা। তারা বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের পাশাপাশি তরুণ সমাজ, গণমাধ্যম, সাবেক সামরিক সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভিপিএসএসসির উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য : সঙ্কট উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব বক্তব্য ও প্রস্তাব উঠে আসে। এতে শিক্ষাবিদ, সাবেক মন্ত্রী, আমলা ও কূটনীতিক, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী (অব:)।
সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। বিভিন্ন সময়ে জাতি ঐক্যবদ্ধ হলেও পরে আবার বিভক্ত হয়েছে। তার অভিযোগ, একটি সম্প্রসারণবাদী ও আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
তিনি আরো বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে আবারো অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম, দেশটির পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ, গোয়েন্দা সংস্থা, ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে এসব প্রচার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দ্রুত পাশে সরিয়ে রেখে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ঐক্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সংলাপের তাগিদ
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সামনে নিরাপত্তা, ঐক্য, সংস্কার, পুনর্মিলন ও নতুনভাবে যাত্রা শুরুর মতো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রত্যাশিত ঐক্য, সংস্কার ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং পারস্পরিক দোষারোপ ও বিদ্বেষ বেড়েছে।
তাদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে থাকা বিভিন্ন শক্তির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো চিহ্নিত করা জরুরি। এসব বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সাথে দ্রুত আলোচনা করতে হবে। একই সাথে গণমাধ্যম ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে অভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে।
আলোচকেরা বলেন, শুধু দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করলেই জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি জনমত ও জনচাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে।
তারা আরো বলেন, জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থরক্ষায় আরো শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে।
তরুণদের নেতৃত্বে আনার আহ্বান
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মুদাসসির এইচ খান, বীরপ্রতীক, জাতীয় ঐক্যের সংজ্ঞা তুলে ধরে বলেন, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোই জাতীয় ঐক্য। তবে এর অর্থ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মতপার্থক্য বিসর্জন দেয়া নয়।
তার মতে ক্ষমতা হারানোর ভয় এবং যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা অর্জনের আকাক্সক্ষা দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম বাধা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আত্মসমালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মুদাসসির এইচ খান বলেন, ২০২৪ সালে যারা বুলেটের মুখোমুখি হয়েছিল, সেই তরুণ-তরুণীদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে নেতৃত্বের সামনের সারিতে নিয়ে আসতে পারলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব।
আলোচনায় শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, শিশু ও নাগরিকদের সচেতন করে তোলা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। প্রবীণ ও তরুণদের সমন্বয়ে বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাব
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যানের প্রস্তাবের সাথে একমত পোষণ করেন বলে আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিস্তার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
আলোচনা থেকে উঠে আসা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিরোধ ও মতপার্থক্যের বিষয়গুলো চিহ্নিত করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সাথে জরুরি সংলাপ আয়োজন, তরুণ সমাজ, সাবেক সামরিক সদস্য, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গঠন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, রাজনৈতিক জবাবদিহি জোরদার এবং সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ।
আলোচকেরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গোলটেবিল আলোচনায় আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাইদুল ইসলাম, কমডোর জসীম উদ্দিন ভূঁইয়া, সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ও সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া, ব্যারিস্টার এম বেলায়েত হোসেন, মাহমুদা চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. নাঈমা মুয়াজ্জমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








