
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও নৌসীমায় ঘনিয়ে এসেছে তীব্র যুদ্ধের মেঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত চলতি সপ্তাহেই ইরানে সামরিক হামলা চালানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়ার পর পুরো অঞ্চলে ব্যাপক অচলাবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও তেলআবিব ইরানের শাসনব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে- নতুন কোনো সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে সমুদ্রগর্ভস্থ যোগাযোগ ক্যাবল (সাবমেরিন ক্যাবল) থেকে শুরু করে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রযুক্তি অবকাঠামো ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হবে। খবর এএফপি, আলজাজিরা, রয়টার্স, মেহের নিউজ, প্রেস টিভি এবং মিডল ইস্ট আই।
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি টম ব্যারাক এক সাক্ষাৎকারে জানান, চলতি সপ্তাহেই ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এই বন্ধু ও ব্যবসায়ী অংশীদার আরো উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্র উৎখাত করতে চায় না, তবে মিত্রদের ওপর ক্রমাগত হুমকির পরিণতি তেহরানকে ভোগ করতেই হবে। অবশ্য ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বিষয়টির সরাসরি কোনো দায় না নিয়ে কিছুটা এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন এবং তিনি বারবার ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার অঙ্গীকার করে যাচ্ছেন। কূটনৈতিক অচলাবস্থার দীর্ঘ পর্যায় শেষে ট্রাম্পের এই নতুন সঙ্কেত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করার গোয়েন্দা তথ্য ও দূতাবাস খালি
মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিওর কাছে পাঠানো এক বিশেষ স্মারকে জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন সতর্ক করে জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে মার্কিন কর্মকর্তা ও নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানের ইরানি পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই গোয়েন্দা স্মারক প্রকাশের পরপরই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। ইয়েমেনের হাউছি বাহিনীর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের কারণে জর্দান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হয়েছে।
হরমুজে মাইন বিস্ফোরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের চরম হুঁশিয়ারি
এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণ অংশে অনুমোদনহীন পথে চলার সময় সমুদ্র-মাইনে আঘাত পেয়ে দু’টি সুপারট্যাংকারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, নৌ-মাইনের আঘাতে জাহাজ দু’টির ইঞ্জিনকক্ষ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো চলাচলের ক্ষমতা হারিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-তে দেয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই মার্কিন সামরিক জাহাজকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে আইআরজিসি অকার্যকর করে দিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন আর ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার কাছাকাছি আসার সাহস পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মরিচাধরা’ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশের ইচ্ছা ‘কবরস্থানে যাবে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবিকে স্ববিরোধী ও বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করার কৌশল বলে আখ্যা দেন এই জ্যেষ্ঠ সেনাপ্রধান।
সাবমেরিন ক্যাবল ও ডিজিটাল অবকাঠামোগুলোকে নিশানার ছক
ব্রিটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের শীর্ষ দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, মার্কিন আগ্রাসন এলে পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট ও সাবমেরিন ক্যাবলগুলোতে হামলা চালানো হবে। তারা স্পষ্ট করেন, হামলায় ক্যাবল বিচ্ছিন্ন করার পর তার মেরামত কাজ দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাহত করাই হবে মূল লক্ষ্য, যেন অঞ্চলটির ডিজিটাল যোগাযোগ ও লেনদেন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। আইআরজিসির রাজনৈতিক উপপ্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর তলদেশে থাকা প্রধান সাতটি ইন্টারনেট ক্যাবল তাদের সরাসরি নিশানায় রয়েছে। এ ছাড়া ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানান, নতুন সঙ্ঘাত শুরু হলে ডেটা সেন্টার, এআই গবেষণাগার এবং মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানো হবে।
হুমকিকে ‘হতাশা’ আখ্যা ও ১১ বিলিয়ন ডলারের অভিযোগ
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ক্রমাগত সঙ্ঘাতময় বক্তব্যকে তাদের ক্ষমতার চেয়ে চরম হতাশা ও দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের। তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে তেহরান তাদের ভঙ্গুর পরিস্থিতির প্রমাণ হিসেবেই দেখছে। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক বার্তায় দাবি করেন, গত তিন বছরে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পেছনে মার্কিন করদাতাদের ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। ইসরাইলকে রক্ষা করতে ওয়াশিংটন নিজের চেয়েও বেশি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে উল্লেখ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই সম্পর্ককে একটি ‘পরজীবী সম্পর্ক’ হিসেবে আখ্যা দেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








