মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় ৩ বন্ধু নিহত
রূপগঞ্জে নিহত- ইয়ামিন, রুদ্র মিয়া ও শ্রাবণ মিয়া।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন শ্রাবণ মিয়া। বিকেলে দুই বন্ধু রুদ্র মিয়া ও ইয়ামিনকে নিয়ে একই মোটরসাইকেলে চড়ে বের হন পূর্বাচলে ঘুরতে। সেই ঘোরাঘুরি আর শেষ হলো না। রাতে ট্রাকের সাথে সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রুদ্র ও ইয়ামিন; গতকাল শুক্রবার হাসপাতালে মারা যান শ্রাবণও। একটি মোটরসাইকেলে তিনজনের সেই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঘরে ফেরা হলো না কারো।
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার বিকেলের মধ্যে আরো ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। এর মধ্যে গাজীপুরের কালীগঞ্জে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হয়েছেন দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান ও এক স্থানীয় বিএনপি নেতা। ফরিদপুরের মধুখালীতে বাস-অ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়িতে নিহত হয়েছে ১২ বছরের শিশু তানিয়া আক্তার। এ ছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় দু’জন, পাবনায় দু’জন এবং মাদারীপুরে একজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে সাতটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৪ জনের। ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-
পূর্বাচল (নারায়ণগঞ্জ)
ভুঁইয়াবাড়ি ব্রিজ এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ট্রাকের সাথে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। জায়গাটি রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের ৩০০ ফুট সড়কে। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ট্রাকটি ছিল কাঞ্চনগামী, মোটরসাইকেল যাচ্ছিল বাঘবেরের দিকে। রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এইচ এম সালাউদ্দিনের ভাষ্য, নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটি ব্রিজের পশ্চিম পাশের সার্ভিস লেন দিয়ে উল্টো পথে যাচ্ছিল।
নিহত রুদ্র মিয়া (১৬) আলমপুর দীঘিরপাড় গ্রামের আক্তার মিয়ার ছেলে ও দশম শ্রেণীর ছাত্র। ইয়ামিন (১৫) দক্ষিণবাগ বেইলারটেক গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে, নবম শ্রেণীতে পড়ত। শ্রাবণ মিয়া (১৯) বাড্ডার জিল্লুর রহমানের ছেলে; এবার এসএসসি পাস করে রাজধানীর একটি কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ছিলেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে আশিয়ান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। কাঞ্চন হাইওয়ে থানার এসআই মাহমুদুর রহমান জানান, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ট্রাকটি পালিয়ে গেছে। ওসি জানান, ট্রাক ও চালককে শনাক্ত করে আটকের চেষ্টা চলছে।
কালীগঞ্জ (গাজীপুর)
টঙ্গী-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক মহাসড়কের তুমলিয়া এলাকায় কালীগঞ্জ সরকারি শ্রমিক কলেজের সামনে শুক্রবার ভোররাত আনুমানিক সাড়ে ৩টায় দুর্ঘটনা ঘটে। কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম তা নিশ্চিত করেছেন। থানা সূত্র জানায়, এসআই মিজানুর রহমানসহ পুলিশের একটি দল সড়কের পাশে টহল ও ওয়ারেন্ট তামিলের কাজ করছিল। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে গাড়ি থামালে কাভার্ডভ্যান তাদের ধাক্কা দেয়। অন্য একটি সূত্রের তথ্য, আটক এক ব্যক্তিকে নিয়ে থানায় ফেরার পথে অজ্ঞাত গাড়ি ধাক্কা দিয়ে পালায়। এতে চারজন আহত হয়। পুলিশের দাবি, মিজানুর ভ্যানের সাথে আটকে গেলে প্রায় আধা কিলোমিটার টেনে নেয়া হয়। 
স্থানীয় রিকশাচালক ও পথচারীরা আহতদের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। সেখানে ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক মোল্লাকে (৪৫) মৃত ঘোষণা করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান মিজানুর (৩০)। আহত পিএসআই জাবেদ ওমর (২৮) ঢাকায় চিকিৎসাধীন। কনস্টেবল ফজলে রাব্বিকে (২৮) গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মধুখালী (ফরিদপুর) : আড়কান্দি এলাকায় শুক্রবার বিকেলে ঢাকাগামী কিংফিশার পরিবহনের একটি বাসের সাথে মাগুরাগামী একটি অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান; তাদের দু’জন পুরুষ ও একজন নারী। নিহতরা কোন যানের যাত্রী ছিলেন, তা জানা যায়নি। করিমপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। উদ্ধার কাজ চলছে।
পানছড়ি (খাগড়াছড়ি) : লতিবান ইউনিয়নের প্রিন্সিপাল পাড়ার সামনের সড়কে শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহিন্দ্রার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে পুরাতন বরনাল এলাকার মো: আনোয়ার হোসেনের মেয়ে তানিয়া আক্তার (১২) নিহত হয়। গুরুতর আহত হয়েছেন বিজিবির নায়েব সুবেদার আব্দুর রাজ্জাক, ডেইজি আক্তার (৩৫) ও আখি আক্তার (১৭)।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রের তথ্য, তানিয়া পরিবারের সদস্যদের সাথে নানাবাড়ি থেকে ফিরছিল। তবে তানিয়ার নানা আমিজুল হক জানান, তারা খাগড়াছড়ি যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। 
আহতদের পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বিজিবি হাসপাতালে নেয়া হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক তানিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য নায়েব সুবেদার রাজ্জাককে গুইমারা বিজিবি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে; বাকি দু’জন পানছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
চকরিয়া (কক্সবাজার) : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের খুটাখালী এলাকায় শুক্রবার রাত সোয়া ১টার দিকে ঢাকাগামী শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের সাথে মালবাহী পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। স্থানীয়রা জানান, সামনের অংশে চাপা পড়ে পিকআপের চালক ও হেলপার নিহত হন। উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, নিহতরা টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আবুল কালামের ছেলে আবদুল্লা (২৮) ও চকরিয়ার রামপুরার মোহাম্মদ দুলালের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াছিন (৩০)। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দু’টি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
পাবনা সদর : গয়েশপুর ইউনিয়নের জালালপুর বাজার এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে দু’টি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জালালপুর থেকে গয়েশপুরের সড়কে মোটরসাইকেল দু’টি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। ঘটনাস্থলেই মারা যান শালাইপুর গ্রামের আব্দুল মতিন মৃধার ছেলে নয়ন মিয়া (২০) ও জালালপুর গ্রামের মৃত মোজাফফর হোসেনের ছেলে সেলিম মাহমুদ (৪০)।
আহত দু’জনকে প্রথমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে একজনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাবনা সদর থানার এসআই মনিরুল ইসলাম ঘটনা নিশ্চিত করেছেন।
মাদারীপুর : ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের তাঁতিবাড়ি এলাকায় শুক্রবার ভোররাতে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মাদারীপুর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে হোটেল মেট্রো নামে একটি আবাসিক হোটেলের মালিক সেলিম হাওলাদার (৫০) নিহত হন। জানা গেছে, নিজের প্রাইভেটকার চালিয়ে কালকিনির ভুরঘাটা থেকে মাদারীপুর শহরে ফিরছিলেন তিনি। পথে মহাসড়কে দুর্ঘটনাকবলিত একটি গাড়ি উদ্ধারে আসা দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের রেকারের সাথে তার গাড়ির ধাক্কা লাগে। গুরুতর আহত সেলিমকে উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মোস্তফাপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ রহমান জানান, সুরতহাল শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অঘোষিত মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত এক যুগে (২০১৪-২০২৫) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৫ হাজার ৭৬১ জন; অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২২ জনের মৃত্যু হচ্ছে। বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের অতিরিক্ত শ্রম ও তদারকির অভাবে পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।