স্থির মুহূর্তগুলোকে আপন করে নেয়ার কঠিন পাঠ ‘লো এক্সপেক্টেশন্স’
স্থির মুহূর্তগুলোকে আপন করে নেয়ার কঠিন পাঠ ‘লো এক্সপেক্টেশন্স’।

আলমগীর কবির 
স্মার্টফোনের প্রতি আমাদের আসক্তি, আর সারাক্ষণ বিনোদন ও নতুন উদ্দীপনা খোঁজার প্রবণতা দেখে মনে হয়, আমরা যেন ক্রমেই একঘেয়েমি সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। অথচ জীবনের বড় একটি অংশই কাটে এমন সব সাধারণ মুহূর্তে, যখন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে না। এই মুহূর্তগুলো এড়িয়ে যাওয়ার বদলে বরং আমাদের সেগুলোকে গ্রহণ করতে শেখা উচিত। নরওয়েজীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা আইভিন্দ ল্যান্ডসভিক তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ‘লো এক্সপেক্টেশন্স’ অত্যন্ত কোমল ও বিষণœ আবহে সেই সত্যটিই অনুসন্ধান করেছেন। ছবির গল্প এগিয়েছে এক তরুণ শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে, যে মানসিক বিপর্যয়ের পর আবার স্বাভাবিক জীবনে টিকে থাকতে শেখার চেষ্টা করছে।
কল্পনা করুন, জীবনের শুরুর বছরগুলো যদি কাটে একের পর এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, সাফল্য ও উত্তেজনার মধ্যে, তাহলে সেই তীব্রতার অবসান ঘটার পর প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনের সাথে মানিয়ে নেবেন কিভাবে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল কাহিনীর বিবরণ শুনে একে খুব আকর্ষণীয় চলচ্চিত্রের উপাদান বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু এই সহজ অথচ গভীর অস্তিত্ববাদী প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই ল্যান্ডসভিক নির্মাণ করেছেন এমন এক চলচ্চিত্র, যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দিতে সক্ষম। ধীরগতির, নীরব এবং জীবনমুখী এই ছবি মূলত দেরিতে ঘটে যাওয়া আত্ম-পরিণতির গল্প; যে গল্প থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। ছবিটির আকর্ষণের বড় একটি কারণ নরওয়েজীয় গায়িকা, গীতিকার ও সঙ্গীত প্রযোজক ম্যারি উলভেনের অভিনয়। সঙ্গীতজগতে তিনি ‘গার্ল ইন রেড’ নামেই পরিচিত। ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন মাজা চরিত্রে; এক তরুণ সঙ্গীতশিল্পী, যে অল্প বয়সেই অনলাইনে প্রায় কাল্ট-তারকার মর্যাদা পেয়ে গেছে। তবে জনপ্রিয়তা তার জীবনে এসেছে হয়তো একটু বেশিই তাড়াতাড়ি।
তারকা-খ্যাতির চাপ এবং ভক্তদের প্রত্যাশার ভারে একসময় মানসিক ও আবেগগতভাবে ভেঙে পড়ে মাজা। এরপর দীর্ঘ বিরতি নিতে হয় তাকে, নিজের মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য। এখন সে আবার বাড়িতে ফিরে এসেছে। তার পাশে রয়েছেন সহানুভূতিশীল মা, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন টোনে মোস্ত্র“ম। আগের জীবনের উন্মাদনা পেছনে ফেলে মাজা এবার কাজ করছে একটি সাধারণ স্কুলে, যেখানে লিখিত পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর নজর রাখাই তার দায়িত্ব।
মাজার নতুন কর্মজীবন তার আগের জীবনের একেবারেই বিপরীত। একসময় সে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে, পার্টি করেছে, কাটিয়েছে উন্মাতাল সময়; ছিল তার নিবেদিতপ্রাণ ভক্তের দল। এখন সে পরীক্ষার হলে বসে শিক্ষার্থীদের দেখাশোনা করে। তার কাজ বলতে যেন কেবল সময় পার হতে দেখা; একটি একটি করে সেকেন্ড গুনে যাওয়া, যা শেষ পর্যন্ত অসহনীয় রকমের একঘেয়ে হয়ে ওঠে।
ম্যারি উলভেন মাজা চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন স্পষ্ট ভঙ্গুরতা ও আন্তরিকতার সাথে। চরিত্রটি যেন এতটাই ক্লান্ত ও আহত যে নিজেকে রক্ষা করার জন্য উদাসীনতার একটি আবরণ তৈরি করেছে। তার নতুন কর্মক্ষেত্র ও বাড়ির জীবন তুলে ধরতে গিয়ে ল্যান্ডসভিক এমন এক চলচ্চিত্রভাষা ব্যবহার করেছেন, যা নরওয়েজীয় নির্মাতা ইয়োয়াকিম ত্রিয়েরের কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। সংলাপের মধ্যে চরিত্রের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, স্বাভাবিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আবেগের প্রকাশ এবং হাস্যরস ও বিষণœতার পাশাপাশি অবস্থান; এসব ক্ষেত্রেই ত্রিয়েরের প্রভাব অনুভব করা যায়।
তবে পরিচিত এই চলচ্চিত্র ভাষা ব্যবহার করেও ল্যান্ডসভিক ত্রিয়েরের অনুকরণে আটকে থাকেননি। সিনেমাটোগ্রাফার আন্দ্রেয়াস বিয়োরসেথের আবহঘন ও কিছুটা অস্পষ্ট চিত্রগ্রহণ, স্থানিক পরিবেশের প্রতি পরিচালকের তীক্ষè মনোযোগ এবং অভিনেতাদের সাবলীল অভিনয় ছবিটিকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। চরিত্রগুলো যেমন অনায়াসে রসিকতায় মেতে ওঠে, তেমনি মুহূর্তেই তাদের কথাবার্তা ও আচরণ দর্শকের মনে গভীর বিষণœতার জন্ম দিতে পারে।
ছবিটির বিষণœ অথচ মধুর আবহের একটি চমৎকার উদাহরণ রয়েছে কেনাকাটার একটি দৃশ্যে। সেখানে মাজা হঠাৎ দেখা পায় তার সাবেক প্রেমিক ও একসময়ের সঙ্গীত-সহযোগীর। পরিস্থিতির অস্বস্তি এড়াতে সে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় পোশাক ও সানগ্লাস কিনতে শুরু করে; যেগুলো কেনার সামর্থ্যও তার নেই।
দৃশ্যটি একই সাথে হাস্যকর ও হৃদয়বিদারক। পুরনো সম্পর্কের মুখোমুখি হয়ে মাজার অস্বস্তি এবং নিজের বর্তমান অবস্থাকে আড়াল করার চেষ্টা এখানে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার আচরণের মধ্যে যেমন রয়েছে তাৎক্ষণিক রসিকতা, তেমনি স্পষ্ট হয়ে ওঠে গভীর বিষণœতা। পরিচালক এই আবেগ ফুটিয়ে তুলতে অতিনাটকীয়তার আশ্রয় নেননি; বরং একটি পরিচিত, দৈনন্দিন পরিস্থিতির মধ্যেই চরিত্রটির অসহায়ত্ব তুলে ধরেছেন।
ছবিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আন্দের্স ড্যানিয়েলসেন লি, যিনি ইয়োয়াকিম ত্রিয়েরের বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এখানে তিনি স্কুলের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইয়োহানেসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। বন্ধু অস্কারের সাথে মিলে মাইকেল মানের ‘হিট’ চলচ্চিত্রটি সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা কি না, তা নিয়ে আলোচনা করে সে। তাদের চরিত্রের পরিচয়পর্বেই ছবিটির কয়েকটি মজার মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে দুজনকে ‘হিট’-এর কিছু দৃশ্য অনুকরণ করতে দেখা যায়।
তবে ইয়োহানেসের ভূমিকা শুধু হাস্যরসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাজা নতুন কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নিতে পারছে কি না, সে বিষয়ে সে আন্তরিকভাবে খোঁজখবর রাখে। বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা ও নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাকে নতুন পরিবেশে স্বস্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
তাদের সম্পর্কটি পুরোপুরি বন্ধুত্বপূর্ণ ও প্লেটোনিক। ইয়োহানেসের আন্তরিকতা মাজার জীবনে এমন এক মানবিক সমর্থনের জায়গা তৈরি করে, যা তার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মাজার অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি রেখে ল্যান্ডসভিক এমন এক চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যে একই সাথে ভারাক্রান্ত, সদয় ও প্রতিভাবান। ছবির চিত্রনাট্য তাকে কোনো একমাত্রিক পরিচয়ে আটকে রাখে না। তার মধ্যে রয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস, আবার রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও মানসিক আঘাত থেকে জন্ম নেয়া অসহিষ্ণুতাও।
মাজার নিজের চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে বিরক্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, স্কুলের একজন শ্বেতাঙ্গ শিক্ষিকা অভিবাসী এক কর্মীর প্রতি স্বাভাবিক কথাবার্তার ছলে বর্ণবাদী আচরণ করছেন। মাজা সেই আচরণের প্রতিবাদ করে।
অন্যদিকে, ইয়োহানেসের কাছে নিজের অতীতের মানসিক আঘাতের কথা খুলে বলা কিংবা মায়ের সামনে পারিবারিক ক্ষোভ বিস্ফোরকভাবে প্রকাশ করার দৃশ্যগুলোতে তার ভেতরের অমীমাংসিত যন্ত্রণা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব মুহূর্তে পরিচালক চরিত্রটির জটিলতাকে আড়াল করেন না; বরং মাজার প্রতি তার গভীর মমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে একজন অসম্পূর্ণ, দ্বন্দ্বে ভরা মানুষ হিসেবেই উপস্থাপন করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত সেই চলচ্চিত্রিক রূপকল্পের বিপরীত, যেখানে প্রতিভাবান পুরুষ শিল্পীর আত্মকেন্দ্রিকতা ও দুর্ব্যবহারকে প্রায়ই তার ‘জিনিয়াস’ সত্তার অংশ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়। মাজা একজন প্রতিভাবান নারী শিল্পী; কিন্তু তার প্রতিভা তাকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করে তোলে না। তার মানসিক বিপর্যয়ও তার চরিত্রের সবকিছুকে ব্যাখ্যা করে না; বরং তার শক্তি, দুর্বলতা, ক্ষোভ ও সহমর্মিতা সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র।

Advertisement