সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি

মিজানুর রহমান দাগনভূঞা (ফেনী)

Advertisement

রাজা নেই, মসনদ নেই, নেই জমিদারি প্রতাপও। এখন শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার প্রতাপপুরের জমিদার বাড়ি। দীর্ঘ দিন সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এ স্থাপনার দালানকোঠা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আগাছায় ঢেকে গেছে রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশ। অথচ ঐতিহ্যবাহী এ বাড়ি দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে বাংলার জমিদারি প্রথার এ নিদর্শনটি হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বাড়িটি সংরক্ষণ ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন জমিদার রামনাথ কৃষ্ণ সাহা ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে বাড়িটি নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি বড়বাড়ি ও রাজবাড়ি নামে পরিচিত। প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এ বাড়িতে রয়েছে অভিজাত নকশার পাঁচটি দ্বিতল ভবন। এসব ভবনে রামনাথসহ তার পাঁচ ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। বাড়ির চারপাশে ছিল ১২টি পুকুর। পুকুরগুলোর পাঁচটিতে ছিল দৃষ্টিনন্দন বৈঠকখানাবেষ্টিত ঘাটলা।
একসময় এ জমিদার পরিবারের প্রভাব ছিল আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। সিন্দুরপুর ও রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বসে তারা ১০টি তালুকের খাজনা আদায় করতেন। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পরিবারের প্রভাব কমতে থাকে। তবে বংশধররা ২০০২ সাল পর্যন্ত এ বাড়িটিতে বসবাস করতেন। ১৯৯৮ সালের দিকে কয়েক দফা হামলা ও লুটপাটের ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতা, ব্যবসায়িক সমস্যা ও যোগাযোগের অসুবিধার কথা ভেবে তারা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান এবং ভারতের ত্রিপুরা ও কলকাতায় চলে যান। যাওয়ার সময় জমি ও পুকুরগুলো স্থানীয় কৃষকদের বর্গা দিয়ে যান বলে জানা গেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, সংস্কার ও পরিচর্যার অভাবে বাড়িটির বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর নিরাপত্তার অভাব, শৌচাগার ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে বাড়িটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ায় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসছেন। তবে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তারা হতাশা ব্যক্ত করেন।
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আতাউর রহমান মারুফ বলেন, জমিদার বাড়িটি দেখতে এসে নানা সমস্যা চোখে পড়ছে। বাংলার জমিদারি প্রথার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে এটি সংরক্ষণ জরুরি। সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করা হলে ঐতিহাসিক নিদর্শনটি রক্ষা পাবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক সুমন বলেন, প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি দাগনভূঞার গর্ব। এটি সংরক্ষণে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি বাংলার জমিদারি প্রথার অন্যতম নিদর্শন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়িটি বর্তমানে ব্যক্তি মালিকানাধীন। মালিকেরা বাড়িটি ইজারা দিয়ে ভারতে চলে গেছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় এ বিষয়ে প্রশাসনের করণীয় সীমিত।