
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর বুধবার মেইতেই-অধ্যুষিত ইম্ফল উপত্যকা ও কুকি-অধ্যুষিত কাংপোকপি জেলায় জনজীবন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। পাল্টাপাল্টি হত্যা, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের জেরে রাজ্যটির পরিস্থিতি চরম রূপ নিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে মণিপুরের চলমান সঙ্কটে তিনটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- সঙ্ঘাতের ভৌগোলিক ও জাতিগত বিস্তার, পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ডকেন্দ্রিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ। খবর এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য সূত্রের।
সঙ্ঘাতের নতুন বিস্তার
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মেইতেই ও কুকি-জো জাতিগত বিরোধের পাশাপাশি মণিপুরে এখন কুকি-নাগা বিরোধের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। গৌহাটিভিত্তিক সূত্রের খবরে জানা গেছে, কাংপোকপি জেলায় পি মুওলডিং গ্রামে বাঁশের কচি ডগা বা অঙ্কুর সংগ্রহ করতে গিয়ে ৪৫ বছর বয়সী পাওলেনমুং থাঙ্গেও নামের এক কুকি ব্যক্তি নিহত হন। গ্রাম কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কোনো উস্কানি ছাড়াই সশস্ত্র নাগা গোষ্ঠীর সদস্যরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এই বেসামরিক নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে।
এর পাশাপাশি উখরুল জেলায় কুকি সম্প্রদায়ের অন্তত ছয়টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কেবল মেইতেই-কুকি নয়, নাগা সশস্ত্রবাহিনীর উপস্থিতি ও নতুন করে এই ত্রিভুজমুখী উত্তেজনা মণিপুরের সঙ্ঘাতকে আরো ভয়াবহ ও জটিল মোড়ে ঠেলে দিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ড, ধর্মঘট ও দুর্ভোগ
মণিপুরে সহিংসতা এখন পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। মঙ্গলবার কাংপোকপিতে কুকি ব্যক্তি নিহত হওয়ার মাত্র একদিন আগে একই এলাকার কাছেই সন্দেহভাজন সশস্ত্র কুকিদের অতর্কিত হামলায় তিন মেইতেই গ্রামবাসী নিহত হন। এই ঘটনার পরপরই সহিংস প্রতিবাদ শুরু হয়।
তিন মেইতেই হত্যার প্রতিবাদে ইম্ফল থেকে নাগাল্যান্ডের সংযোগকারী ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়ক সংলগ্ন নাগরিক সংগঠন ‘নেটিভ পিপলস কমিটি মণিপুর’-এর ডাকে ইম্ফল উপত্যকায় ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। বুধবার দ্বিতীয় দিনে ইম্ফল পশ্চিম ও ইম্ফল পূর্বসহ পাঁচটি জেলার প্রধান বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
অন্য দিকে পাওলেনমুং থাঙ্গেও হত্যার প্রতিবাদে এবং যৌথ অভিযানে ‘বাছবিচারহীন’ গ্রেফতারের অভিযোগে কাংপোকপির উপজাতি ঐক্য কমিটিও সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটের কারণে সেখানেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। উপজাতি ঐক্য কমিটির দাবি, নতুন করে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩২ জন কুকি-জো প্রাণ হারিয়েছেন, ৩০টি গ্রামের ২৭১টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং ২ হাজার ৫১৬ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা
সহিংসতা বন্ধে ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিন মেইতেই নিহতের পর ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংয়ের বাসভবনের মূল ফটকের সামনে দুই যুবকের লাশ রেখে ব্যাপক প্রতিবাদ জানান। গঠিত ‘যৌথ কর্মপরিষদ (জেএসি)’ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেয়া পর্যন্ত তারা লাশ গ্রহণ করবে না।
এ দিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানের বিষয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সোমবারের হামলায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ নিষিদ্ধ কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্টের (এন) তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নিরাপত্তা বাহিনী (পুলিশ, সিআরপিএফ, আসাম রাইফেলস ও এনএসএফ) ১২টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র (যার মধ্যে একে-৪৭, এম১৬, ইনসাস, রকেট লঞ্চার), টিএনটি বিস্ফোরক ও এক হাজার ৯৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এছাড়া ‘সিনাই’ নামক একটি নিয়ন্ত্রিত শিবির থেকে ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
তবে এই গ্রেফতারকে ‘বাছবিচারহীন’ আখ্যা দিয়েছে কুকি সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ, সুষ্ঠু তদন্তের আগেই বেসামরিকদের রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার বানানো হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা কংগ্রেস সভাপতির
ভারতের মণিপুরে নতুন করে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। তিনি বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্তবর্তী রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে খাড়গে লেখেন, ‘বিজেপির অযোগ্যতার কারণে মণিপুর আবারো রক্তাক্ত হচ্ছে। সর্বশেষ সহিংসতায় চার নিরীহ নাগরিকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড গভীরভাবে নিন্দনীয়।’ এ সময় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান তিনি।
খাড়গে বলেন, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে ৩০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মানবেতর পরিস্থিতিতে ত্রাণশিবিরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন ২৪ হাজার ৫৩০ জন। দীর্ঘস্থায়ী এই সঙ্কটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু ও অসহায় পরিবারগুলো।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








