ইসরাইলের নির্বাচনে নেতা বদলাতে পারে, ইরান যুদ্ধনীতি নয়


আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসরাইলের নির্বাচনে হয়তো দেশটির নেতা পরিবর্তিত হতে পারেন, কিন্তু তাদের কৌশল অপরিবর্তিতই থাকবে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইরান ইসরাইলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই থেকে যাবে, সামরিক শক্তি প্রয়োগই তাদের পছন্দের হাতিয়ার হিসেবে বজায় থাকবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি সুদূর পরাহতই থেকে যাবে। 
এর কারণ হলো ইসরাইলি নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করা কৌশলগত ধারণাগুলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরাইলের জনবসতিগুলোতে চালানো হামলা এবং গাজা, লেবানন ও ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের ফলে আরো সুদৃঢ় হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল বরং তাদের নিরাপত্তা নীতি আরো কঠোর করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যদি কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীদের সমর্থনে জয়ী হন, তবে তিনি ইরানের সাথে যুদ্ধ আরও জোরদার করতে পারেন, অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করতে পারেন এবং কূটনীতিকে আরও প্রান্তিক পর্যায়ে ঠেলে দিতে পারেন। ইসরাইলের বর্তমান নিরাপত্তা মতবাদ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে : ইরানকে দুর্বল করা, সীমান্তের বাইরে বাফার জোন বা মধ্যবর্তী অঞ্চল বজায় রাখা এবং শত্রুদের দমনে সামরিক শক্তির ব্যবহার। 
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে মূল পার্থক্যটি কৌশলের দিক থেকে নয়, বরং মাত্রার দিক থেকে; অর্থাৎ ইসরাইল কতটা আগ্রাসীভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করবে, পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি কতটা সম্প্রসারণ করবে এবং কোনো নেতা আদৌ কূটনীতির পথ বেছে নেবেন কি না, তা নিয়েই মূলত মতপার্থক্য রয়েছে। 
তেহরান থেকে রিয়াদ- সব জায়গাতেই মঙ্গলবারের এই নির্বাচনকে কোনো সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটিকে এমন একটি পরীক্ষার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্য কি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কি না- যেখানে যুদ্ধ কখনো তীব্র হয় আবার কখনো কিছুটা স্তিমিত হয়, কিন্তু মূল সঙ্ঘাতগুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়। নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কি বলেন, নেতানিয়াহু যদি নির্বাচিত হন, তবে তিনি যা করতে চাইবেন, তাই করবেন। ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধও চলতে থাকবে। তিনি আরো বলেন, এখন যা দেখছেন, নির্বাচনের পরও ঠিক তা-ই দেখবেন, হয়তো আরো বেশি আগ্রাসী রূপে। ইরান যতক্ষণ এমন পরিস্থিতিতে থাকবে, ততক্ষণ ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলা কেবল সময়ের অপচয়। নেতানিয়াহু  রোববার বলেছেন যে, ইসরাইলের উচিত ‘নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরক্ষার’ চেয়ে ‘প্রতিরোধ ও আক্রমণ’-কে বেশি গুরুত্ব দেয়া। এর মধ্যে রয়েছে উদীয়মান হুমকিগুলোকে নস্যাৎ করার জন্য আগাম হামলা চালানো। একই সাথে ইসরাইলকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বনির্ভরতা অর্জন করাও তাদের লক্ষ্য।
এই নীতি কেন পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম: এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ‘লিকুদ’ দল ও তাদের অতি-জাতীয়তাবাদী মিত্রদের বিপরীতে রয়েছে সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াশার’ দলের জোট। ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক ঘাসান আল-খতিব মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরাইলের নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কারণ, জনমত আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ায় ইসরাইলি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আরো কঠোর অবস্থানের অধিকারী হিসেবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তিনি বলেন, নীতির মূল বিষয়বস্তু একই রয়ে গেছে: ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতা এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের বিস্তার অব্যাহত রাখা-এ বিষয়ে তারা সবাই একমত।
আল-খতিবের মতে, নেতানিয়াহুর বিরোধীদের নেতৃত্বে কোনো সরকার গঠিত হলে তারা হয়তো বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছুটা কমিয়ে অথবা বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি কম প্রচারণার মাধ্যমে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে। তবে এ ধরনের পরিবর্তন হবে কেবল কৌশলের পরিবর্তন, মূল নীতির নয়। 
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মাইকেল ইয়াং বলেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক শ্রেণীর বড় একটি অংশের মধ্যে একটি অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানকে মোকাবিলা করা, ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ (সীমানার বাইরে গিয়ে প্রতিরক্ষা) বজায় রাখা এবং সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা অটুট রাখা; যা বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের সুযোগকে সীমিত করে ফেলে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জোস্ট হিলটারম্যান, যিনি পশ্চিমতীরে গবেষণা চালিয়েছেন, তিনি জানান যে, বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, ফিলিস্তিনিদের বাড়তে থাকা হতাশা এবং কোনো ধরনের ‘রাজনৈতিক দিগন্ত’ বা ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপরেখার অনুপস্থিতি এমন এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেখানে সামান্য একটি ঘটনাও বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান উসকে দিতে পারে।
 

Advertisement