
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরান তার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তেল আবিব। এমনটি হলে ইসরাইল ইরানে হামলা চালাতে পারে। যদিও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন পদক্ষেপ নেবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি পাল্টে গেলে ইসরাইল হামলা চালাতে পারে। সম্প্রতি ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকে আলোচনার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে জেরুসালেম পোস্ট। খবরে বলা হয়েছে, অপারেশন রোয়ারিং লায়নে ক্ষয়ক্ষতির পর ইরান কিভাবে সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করেছে ইসরাইল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের নতুন করে সামরিক প্রস্তুতি নেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইসরাইলের কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব প্রস্তুতি শেষ হলে ইরানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর আগে সঙ্ঘাতের পর ইরানের দ্রুত সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছিল।
আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু চান নির্ধারিত পরিকল্পনা ও সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে ইসরাইল জরুরি পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে তা সম্ভব হবে না। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সামরিক প্রস্তুতি ও তৎপরতার গতির ওপর পরিস্থিতির পরিবর্তন নির্ভর করছে। নতুন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সাথে সাথে ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক মূল্যায়নও হালনাগাদ করা হচ্ছে।
ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা
নির্বাচনের আগে উত্তেজনা এড়িয়ে চলার ইচ্ছা থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না ইসরাইল। কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে ইসরাইলকে আত্মরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হতে পারে- এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা যায় না।’
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার আকস্মিক ও সংক্ষিপ্ত সফরে ইসরাইল যান। সেখানে দক্ষিণ ইসরাইলের ওভদা বিমানঘাঁটিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করেন তিনি। ইরানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনা জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান শমুয়েল বেন এজরা এবং অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় নতুন করে অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা পেন্টাগন আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। হেগসেথের ইসরাইল সফরের আগে প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি, জানানো হয়নি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিও। জেরুসালেমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা তেল আবিবের কিরিয়া সামরিক সদর দফতরের পরিবর্তে দক্ষিণ ইসরাইলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং ইরানকে নিয়ে দুই দেশের চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে বৈঠকের স্থানটিও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কঠোর অবস্থানে ইরান
এ দিকে নিজেদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা হবে না বলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে জানিয়েছে ইরান। গত মঙ্গলবার তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে বৈঠকে ইরানের নেতারা এ অবস্থান জানান। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম নূরনিউজ জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠকে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মধ্যস্থতার উদ্যোগ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। এর আগে পাকিস্তানের উদ্যোগে জুনে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার সঙ্ঘাত শুরু হলে ইসলামাবাদ সমঝোতা ভেঙে পড়ে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সাথেও বৈঠক করেন আসিম মুনির। ইরানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বৈঠকের বিবরণ অনুযায়ী, গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার বিষয়ে গত মাসে ইরানের উত্থাপিত সাতটি শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত তেহরানের আস্থা ফিরে পাবে না ওয়াশিংটন। ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং আঞ্চলিক সব রণাঙ্গনে সঙ্ঘাত বন্ধ করা। ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইও আসিম মুনিরের সাথে পৃথক বৈঠকে একই অবস্থান তুলে ধরেন। ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, তেহরানের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা হবে না বলে জানান তিনি।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে না বলেও জানিয়েছেন রেজাই। তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান ইরানেই থাকবে। অন্য দিকে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের দাবি পূরণ এবং আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা ইরানের ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরে। বেসামরিক ব্যবহারের জন্য সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ হতে পারে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দুই দেশের মধ্যে সঙ্ঘাত বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও তেহরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি নয় ইরান। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কখনো আত্মসমর্পণ করবে না ইরান : আরাকচি : যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি বলেছেন- কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। খবর মেহের নিউজ এজেন্সির। মঙ্গলবার রাতে ইরাকি গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক আল-আখবারিয়াকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাকচি। তিনি বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের বিরোধের মূল কারণ ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং দেশটির ওপর মার্কিন আধিপত্য মেনে না নেয়া। তার মতে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ মূল সমস্যার অজুহাত মাত্র। আরাকচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি অবস্থান মেনে নিতে চায় না, যেখানে মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতা করা হবে এবং দেশটির ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করা হবে না। এ কারণেই পরমাণু ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলোচনা নিয়ে অবিশ্বাসের কথাও তুলে ধরেন ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এর আগে তিন দফা আলোচনায় বসেছিল ইরান। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে। গত বছরের জুনে এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে চালানো হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার দাবি, দুই দফা হামলার সময়ই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছিল। এ ছাড়া গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল, যা পরে যুক্তরাষ্ট্র লঙ্ঘন করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আরাকচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ওপর আস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








