
এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো
মাঠে কিশোরদের ধরপাকড় চলছে, অথচ আড়ালে থেকে যাচ্ছে অপরাধচক্রের নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক ও পৃষ্ঠপোষকরা। সিলেটে এক সপ্তাহে তিন শতাধিক কিশোরকে আটকের পরও কিশোরগ্যাংয়ের তৎপরতা পুরোপুরি থামেনি। অভিযানের চাপে গা-ঢাকা দেয়া সদস্যদের অনেকে আবারো সক্রিয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও সহিংসতার মতো অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও তাদের পেছনে থাকা কথিত ‘বড় ভাই’ ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশ বলছে, দুর্গাপূজা শেষে কিশোরগ্যাংয়ের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও বড় অভিযান চালানো হবে।
আধিপত্য নিয়ে ঘটছে খুন
সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন আর দলবদ্ধ মারামারি কিংবা পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তারে সীমাবদ্ধ নেই। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক সেবন, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, জুয়া এবং দলবদ্ধভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, আবার কোথাও মিছিল-মিটিংয়ে লোক জড়ো করতেও কিশোরদের ব্যবহার করার হচ্ছে। এসব বিরোধের কোনো কোনোটি প্রাণঘাতী সংঘর্ষেও রূপ নিচ্ছে। গত ২৭ জুলাই ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে সিলেট নগরীর কাজিরবাজার সেতুর ওপর ছুরিকাঘাতে খুন হয় কিশোর রিফাত আহমদ (১৫)। রাত ১০টার দিকে একদল কিশোরের হামলায় তার মৃত্যু হয়। রিফাত নগরীর খাসদবির এলাকার দারুস সালাম বন্ধন জি-৩ বাসার মিফতাহ উদ্দিনের ছেলে। সে স্থানীয় দ্বীপশিখা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। তুচ্ছ বিরোধের জেরে তার এমন মৃত্যু নগরীতে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সামনে নিয়ে আসে।
কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো ব্যক্তি কিশোরদের ব্যবহার করেন। তাদের দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ফলে কেবল মাঠপর্যায়ের সদস্যদের আটক নয়, অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
এক সপ্তাহে আটক তিন শতাধিক
কিশোরগ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ ও নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গত এক সপ্তাহে বিশেষ অভিযান চালায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। অভিযানে তিন শতাধিক কিশোরকে আটক করা হয়। গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে এসএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে ১৭০ জনের অভিভাবকদের ডেকে আনা হয়। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অভিযানে সিলেটের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী আটক হয়েছেন, তাদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৩০ জনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিলেটে ১৫ গ্যাং
পুলিশ সদর দফতরের তালিকা অনুযায়ী, সিলেটে ১৫টি গ্যাংয়ের সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে। তবে গ্যাং কিংবা সদস্যের সংখ্যা দিয়ে অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। কোন গোষ্ঠী কী ধরনের অপরাধে জড়িত, তাদের সাথে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের যোগাযোগ রয়েছে কি না এবং কারা তাদের অর্থ, আশ্রয় কিংবা প্রভাব জোগাচ্ছে- এসব তথ্য শনাক্ত করা জরুরি। অন্যথায় সদস্যদের আটক করেও গ্যাংয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
নজর দিতে হবে নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের দিকে
কিশোরগ্যাং দমনে অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু আটক ও অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়ার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন। অপরাধে জড়িত কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি তাদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, অর্থের উৎস ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রয়োজন।
একই সাথে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া কিশোরদের পরবর্তী নজরদারি, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধে জড়িত ব্যক্তির রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যা-ই হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সিলেটে তিন শতাধিক কিশোরকে আটকের ঘটনা পুলিশের তৎপরতার ইঙ্গিত দিলেও কিশোরগ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলই হবে আসল পরীক্ষা। পূজার পর ঘোষিত অভিযান কতটা কার্যকর হয়, নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকরা আইনের আওতায় আসেন কি না এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি কতটা বন্ধ হয়, সেদিকেই এখন নজর নগরবাসীর। মাঠের সদস্যদের আটক করে নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের আড়ালে রেখে দিলে কিশোরগ্যাংয়ের কৌশল বদলালেও অপরাধের চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








