প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গুরুত্ব পাবে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬ অক্টোবর চারদিনের সফরে জাপান যাচ্ছেন। এই সফরের জাপানের সাথে সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর বাংলাদেশ গুরুত্ব দেবে। এছাড়াও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ সফরে দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য সম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিমান পরিবহন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণ  সংক্রান্ত সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারকের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সফরের ওপর আলোকপাত করে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এ সব কথা জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বেশ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করছে। আমরা আশা করছি, এই সফরের সময় তার মধ্যে কয়েকটি স্বাক্ষরিত হবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই সফর বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরো গভীর করার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করবে। গত  ফেব্রুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষরের ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এবারের সফরে ইপিএ বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশটি মেট্রো রেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির মতো বড় অবকাঠামো ও পরিবহন প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে আসছে। এই সফর চলমান প্রকল্পগুলোর গতি ত্বরান্বিত করতে, নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং অর্থনৈতিক, উন্নয়নমূলক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা জোরদার করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানি সহায়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। এগুলো  প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আসাদ আলম সিয়াম জানান, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বাইরেও দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করবেন। প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি  ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রধানদের সাথে বৈঠক। সফরসূচিতে জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা পরিদর্শনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক বিষয়ক সদর দফতর এবং নাগোয়াতে অবস্থিত টয়োটার কারখানা।
জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুন্দ্রবন্দরকে  কেন্দ্র করে একটি ‘শিল্প ভ্যালু  চেইন’ গড়ে তুলতে চায় জাপান। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে জুড়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। আঞ্চলিক সম্পর্কের জায়গা থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে- এমন প্রশ্নে আসাদ আলম সিয়াম বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অর্থাৎ ১০ বছর পরে আমরা যে পরিমাণ আমদানি-রফতানি করব, সেই পরিমাণ পণ্য হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা আমাদের বন্দরগুলোর থাকা প্রয়োজন। সেখান  থেকেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর সম্প্রসারণ কনসেপ্ট ডেভেলপ করেছিল।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম পাতাল  মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়ানো হয় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ প্রকল্পের অর্থায়ন করছে জাপান। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এই ব্যয় কমিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো আলোচনা করবেন কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমরা তো জাপানের কাছে নানা ধরনের অবকাঠামো তৈরির জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে থাকি। দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয়  বৈঠকে এই অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়গুলো নিশ্চয় আলোচিত হবে। মেট্রোরেল ছাড়াও অন্যান্য অবকাঠামোগত পারস্পরিক সহযোগিতা বিদ্যমান। সুতরাং  সেখানেও বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিনি বলেন, আমরা সব দেশের কাছ  থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চাই। কিন্তু  বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কারণও থাকে। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফলটা আলোচনার পরেই দেখা যাবে।