
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতে ককরোচ পার্টির বিক্ষোভে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনার পর অনেকে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। রাস্তায় তাদের পাওয়া মাত্রই হেনস্তা করা হচ্ছে। একটি বিক্ষোভের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর, হুমকির কারণে এক কিশোরীর জীবন তছনছ হয়ে যায়, যা তাকে এবং তার পরিবারকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করে। ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে গার্ডিয়ান দেখতে পেয়েছে, ২৪ জুলাইয়ের আগে, ‘আর’ (ছদ্মনাম) নামের এক কিশোরী তার কৈশোরের সাধারণ রুটিন নিয়েই ব্যস্ত থাকত : মেকআপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গণিতের হোমওয়ার্ক নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ এবং চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া।
সেই মাসে, যখন দেশজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ১৫ বছর বয়সী মেয়েটি তার ফোনে দেখছিল কিভাবে তরুণ-তরুণীরা শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ভিড় জমাচ্ছে। সে-ও সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভস্থল থেকে আসা ১১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ, যেখানে সে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে মন্তব্য করার পর, তার জীবনকে ওলট-পালট হয়ে গেছে। সেই ঘটনার পর জীবন নিয়ে দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে ‘আর’ বলে, ‘আমার নিজেকে একজন অপরাধীর মতো মনে হচ্ছে, যেন আমি কাউকে খুন করেছি। আমি ভুল শুধরে নেয়ার সুযোগ পাইনি। নিজের দেশেই আমার সাথে শত্রুর মতো আচরণ করা হচ্ছে।’
সেই প্রতিবাদের পর ৮৬ দিন কেটে গেছে; কিন্তু নিরাপত্তার ভয়ে আর বাড়ি থেকে বের হন না; সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার সৃষ্ট বাস্তবতায় তিনি আটকা পড়েছেন।
সপ্তাহব্যাপী গ্রীষ্মকালীন সেই আন্দোলনে বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি থেকে একটি ছাত্র মিছিলে পুলিশের সহিংস দমন-পীড়নের পর সেই ক্ষোভ মোদি সরকারের দিকে গড়ায়। প্রায় বন্দী জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আর বলেন, সেই সপ্তাহে আমি প্রতি রাতে যন্তর মন্তরে যেতাম, কারণ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সেখানে ভিড় জমাতেন। প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ডগুলো, যা আগে মূলত প্রধানকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল, এখন ক্রমেই মোদি এবং তার প্রভাবশালী ডেপুটি অমিত শাহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যার মন্ত্রণালয় দিল্লি পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ভাষা প্রায়ই অশ্লীল ও যৌনতাপূর্ণ ছিল এবং সরকারি সমর্থকরা দ্রুত বিক্ষোভকারীদের নিন্দা করার জন্য এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলো এই অসম্মানজনক ভাষা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চালায় এবং সমবেতদের উদ্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নারীদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল; বিজেপি সমর্থকরা সোশ্যাল মিডিয়ার ক্লিপ থেকে তাদের শনাক্ত করে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে দেয়।
আর নিজেকে এই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে খুঁজে পান। শান্তিভঙ্গের উসকানি দেয়ার উদ্দেশ্যে অপমান এবং জনশৃঙ্খলা বিঘিœত করতে পারে- এমন মন্তব্য করার জন্য তার বিরুদ্ধে একটি পুলিশি মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগকারী স্বাধীন সংবাদ সংস্থা স্ক্রলকে জানান যে, তিনি আর-কে ফোন করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। প্রধানের পদত্যাগের পর, মোদি ইনস্টাগ্রামে ‘কিছু দুষ্টু ছেলেমেয়েদের’ তার বিরুদ্ধে অশ্লীল গালাগাল ব্যবহারের বিষয়ে পোস্ট করে বলেন : ‘এটি একটি সাংস্কৃতিক ধাক্কা। আমাদের মেয়েরা কিভাবে এভাবে কথা বলতে পারে?’ মোদি আরো বলেন যে, ছেলেমেয়েদের শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেয়া উচিত।
এ দিকে আর মোদির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। স্বল্প আলোতে ধারণ করা একটি ঝাপসা ভিডিওতে, আর একটি ডোরাকাটা টি-শার্ট পরে একটি অনুজ্জ্বল সাদা দেয়ালের সামনে নমস্কারের ভঙ্গিতে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ওই কথাগুলো বলতে আমার এতটাই লজ্জা লাগছে যে আমি চোখও তুলতে পারছি না। এর জন্য আমি পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চাইছি- এটাই আমার প্রথম এবং শেষ ভুল। (স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, আর-এর ভিডিওটি পোস্ট হওয়ার পর অভিযোগকারী পুলিশের কাছে করা মামলাটি তুলে নেন।) ওই ভিডিওটা বানানোর পর আমি কেঁদে ফেলেছিলাম, আমি খুব অসহায় বোধ করছিলাম।’
কিন্তু তার ক্ষমা প্রার্থনা নির্যাতন থামাতে খুব একটা কাজে আসেনি। তিনি ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি, গালাগালপূর্ণ ফোন কল, টেক্সট মেসেজে অবিরাম সতর্কবার্তা, দরজায় ধাক্কা এবং দিল্লির উপকণ্ঠে তার অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের বাইরে গাড়ি আসার মতো ঘটনা দেখতে পাচ্ছেন। ‘আমি বুঝতেই পারছিলাম না কী হচ্ছে,’ ঘটনার পরের প্রথম দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে আর-এর চোখ ছলছল করে ওঠে। ‘আমার মায়ের চেয়েও বয়স্ক লোকেরা আমাকে ‘রান্ডি’, ‘আতঙ্কবাদী’, ‘দেশদ্রোহী’ বলে ডাকছিল। অন্যরা আমাকে খুঁজে বের করার জন্য ১১ হাজার এবং আমাকে মারার জন্য ২১ হাজার রুপি দেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছিল।’
ফোন নম্বর ও ঠিকানা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আর এবং তার মা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। থাকার জন্য বাড়ি ভাড়া দিতে ইচ্ছুক এমন বাড়িওয়ালা খুঁজে পেতে তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারা প্রথমে একটি, তারপর আরেকটি এবং তারপর আরো একটি অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে পান। তার মা, যিনি একজন একক অভিভাবক, টিউশনি করে যে আয় করতেন তা বন্ধ হয়ে যায়। বারবার বাসা বদলের খরচ মেটাতে তিনি তার স্বর্ণের গয়না বিক্রি করে দেন। সেই টাকাই তাদের কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। তার ধারণা, এই টাকা দিয়ে সম্ভবত আরো চার মাস চলবে। সময় ফুরিয়ে আসায় তার মা মরিয়া হয়ে কাজের সন্ধান করছেন।
এই সময়ে আর স্কুলে যায়নি এবং ফেরার কথা এখন আর ভাবতেও পারে না। কিছু বন্ধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, ফলে সে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। সে জানায়, ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও দেয়া সত্ত্বেও সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলো তাকে ক্রমাগত হেনস্তা করে চলেছে। আগস্টের শেষের দিকে, আরো একটি গণমাধ্যম দলের উপস্থিতিতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও আপলোড করে, যেখানে সে তার ভেতরের সব কথা খুলে বলে।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে আরো বলেন, ‘মোদিজি, আমার জীবনটা নরক হয়ে গেছে। এখন আমি কোথাও যেতে পারি না, আমার কোনো স্বাধীনতাও নেই। আমি কোথাও থাকতে পারি না। আমাকে মুখ লুকিয়ে বাঁচতে হয়। কাউকে এক রাতের মধ্যে গৃহহীন করে দেয়াটা একটা বড় ব্যাপার।’
আর চায় মানুষ বুঝুক তার অভিজ্ঞতাটা কতটা মর্মান্তিক ছিল। এখন ঘরের ভেতরে আটকে থেকে সে দেখছে প্রতিবাদের আরেকটি ঢেউ শুরু হয়েছে। এবারের প্রতিবাদটি বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে, যার ফলে ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যেসব ছাত্রছাত্রীর ওপর নৃশংসতা চালানো হচ্ছে এবং যাদের আটক করা হচ্ছে, আর তাদের প্রতি আর সংহতি বোধ করে। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন সে তাদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য প্রলুব্ধ হয়েছে। কিন্তু তার মা এবং তাদের অনিশ্চিত আবাসন পরিস্থিতির কথা ভেবে সে নিজেকে আটকে রেখেছে।
তবুও আর বলে, ‘আমি আর ভয় পাই না। আমি এর মধ্যেই সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার করে এসেছি।’ কিন্তু সে তার মাকে আর কোনো কষ্ট দিতে চায় না। প্রতিবাদের কয়েকদিন আগে, আর তার ১৫তম জন্মদিনের পরিকল্পনা করছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা একটি ট্রেন্ডকে নতুন করে শুরু করার জন্য সে একটি অটোরিকশার ভেতরে বসে তার জন্মদিনের কেক কাটতে চেয়েছিল।
তার ১৫ বছর বয়স হয়েছে মাস দুয়েক। এখন সে কী চায় বা কী আশা করে এমন প্রশ্নের জবাবে সে একটু থেমে বলে, ‘আমার অতীত আমার হাতে নেই। আমি তা বদলাতে পারি না। এখন আমি শুধু সামনের দিকে তাকাতে চাই এবং বোর্ড পরীক্ষায় ভালো করতে চাই।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








