
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের জ্বালানি খাতে আগামী দুই থেকে তিন বছরে বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ সময়ে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও বিনিয়োগ বাড়াতে চায় সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি সঙ্কট, আর্থিক দায় ও কাঠামোগত দুর্বলতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে সরকার। তবে সরকারের মেয়াদের দ্বিতীয় বছর থেকে অর্থনীতিসহ জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আসবে বলে তিনি আশাবাদী। পরবর্তী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গতকাল (সোমবার) রাজধানীতে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) আয়োজিত ‘ টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি : বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা দূর করা এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য সরকার বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারেও ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সাথে স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো হবে। এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে ভাসমান ও স্থলভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তেল সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থায়ন সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মন্ত্রীর মতে, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতিনির্ধারণী ও রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত কার্যক্রম পৃথক করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ উদ্যোগ রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
এ সময় বেসরকারি খাতকে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা সম্ভব।
সভায় ফিকির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার দুর্বলতা সামনে এনেছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে এবং ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, জ্বালানি অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশবিষয়ক জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যমান গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যেতে পারে। দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসা এবং এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, গ্যাসের অপচয় কমানো, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। সভায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ সময় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








