
নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, চুরিও বেড়েছে। এটা ক্রেতাদের অভিযোগ। পাম্প থেকে তেল নেয়ার পরে তা মেপে যাচাই করার সময় কোথায়! কোনো ক্রেতাই নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না লিটারে কতটুকু তেল তারা পাচ্ছেন। আর না মেপে প্রতিবাদই করবেন কিভাবে? প্রতিবাদ করেও তো লাভ নেই। অহেতুক চিৎকার! পাম্পগুলোতে এ কারচুপি নতুন নয়, বছরের পর বছর চলে আসছে। মাঝে মধ্যে কর্তৃপক্ষ অভিযান চালালেও তা হয়তো প্রয়োজনের শতভাগের একভাগও নয়।
নগরের পাম্পগুলোতে মাদারবোর্ড ও সফটওয়্যার কারসাজি, নজেলে পরিমাপে গরমিল, ডিপো থেকে সিন্ডিকেট ও পরিমাপগত অনিয়মের মাধ্যমে জ্বালানি তেল চুরির বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি পেট্রলপাম্পে বিএসটিআইর একাধিক মোবাইল কোর্ট অভিযানে ধরা পড়েছে ভয়াবহ কারচুপি। প্রতি ১০ লিটার তেলের দাম নিলেও দেয়া হচ্ছিল মাত্র ৯ লিটার। দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের ঠকিয়ে অবৈধভাবে মুনাফা করার অভিযোগে দু’টি প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানার পাশাপাশি ডিসপেন্সিং ইউনিট সিলগালা করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
প্রাইভেটকার ও বাইকের গ্রাহকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে অসাধু পাম্প মালিকরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল মিটারে কারসাজি করে আসছেন। তারা পাঁচ লিটার তেলে ১২০ মিলি লিটার পর্যন্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ লিটারে ১ লিটার পর্যন্ত তেল কম দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল ডিপো থেকেও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার তেল চুরির অভিযোগ রয়েছে, যা পরে খোলাবাজার বা অনলাইনে বিক্রি করা হয়। তবে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে বিএসটিআই ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং দোষী পাম্পগুলোকে লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত ১৩ অক্টোবর মহাখালীতে সোহাগ ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টারে জ্বালানি তেলের পরিমাপ যাচাই করে সতর্ক করে বিএসটিআই। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাবেকুন নাহারের নেতৃত্বে রাজধানীর মহাখালী এলাকায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় মেসার্স সোহাগ ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টারে (৬৫, শহীদ তাজউদ্দিন স্মরণী, মহাখালী রেলগেট (দক্ষিণ), ঢাকা) জ্বালানি তেলের পরিমাপ যাচাই করা হয়। যাচাইকালে নির্ধারিত টলারেন্সের মধ্যে কম-বেশি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয়। দ্রুততার সাথে প্রতিটি ইউনিটের পরিমাপ সঠিক করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে গত ৭ অক্টোবর মহাখালীতে বিএসটিআইর মোবাইল কোর্টে ইউরেকা এন্টারপ্রাইজের জ্বালানি তেলের পরিমাপ সঠিক পাওয়ায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়।
বিএসটিআইর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল ইসলামের নেতৃত্বে মহাখালী এলাকায় ডিএমপির সহযোগিতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় ইউরেকা এন্টারপ্রাইজের (সিএনজি স্টেশন), (১৭/১, বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সড়ক, মহাখালী, ঢাকা) জ্বালানি তেলের পরিমাপ যাচাই করা হয়। যাচাইকালে প্রত্যেকটি ডিসপেন্সিং ইউনিটে জ¦ালানি তেলের পরিমাপে সঠিক পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ, ওই প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়।
এর আগে গত ৮ জুন রাজধানীর মগবাজারে সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সরণির মইন মোটরস ফিলিং স্টেশনে পরিচালিত আরেকটি অভিযানে অকটেন সরবরাহকারী একটি ডিসপেন্সিং ইউনিটে অনিয়ম ধরা পড়ে। এ অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিট সিলগালা করা হয়। ৭ জুন রাজধানীর দারুস সালাম থানার কল্যাণপুর এলাকায় অবস্থিত সোহরাব সার্ভিস স্টেশনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির চারটি ডিসপেন্সিং ইউনিট পরীক্ষা করা হলে দু’টিতে গুরুতর কারচুপির প্রমাণ পায় বিএসটিআই।
যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রতি ১০ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি ইউনিটে এক হাজার ৮০ মিলিলিটার এবং অন্যটিতে ৯৮০ মিলিলিটার তেল কম দেয়া হচ্ছিল। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ‘ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮’-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট দু’টি ডিসপেন্সিং ইউনিট তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ ও সিলগালা করা হয়।
বিএসটিআই জানায়, দু’টি অভিযানে মোট দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অভিযানের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিক্রিতে পরিমাপগত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেয়া হয়েছে। ওই সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন বিএসটিআইর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন্নেসা খানম এবং সাবেকুন নাহার। প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পরিদর্শক (মেট্রোলজি) রাভী মোহাম্মদ ইতমাম। এ ছাড়া অভিযানে ফিল্ড অফিসার সুমাইয়া আফরোজ লিজা এবং পরিদর্শক (মেট্রোলজি) রেজওয়ানুল ইসলাম অংশ নেন। তবে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা এবং জ্বালানি তেল সরবরাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ।
ইসহাক নামের এক বাইকার গত ৮ অক্টোবর কোনাপাড়ার পেট্রলপাম্প থেকে ৫০০ টাকার তেল কেনেন। বাইকের ইন্ডিকেটর দেখে তার মনে হয় ৩০০ টাকার তেলও ঢোকেনি। পাম্প শ্রমিকের কাছে এমনটি হওয়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই সে ক্ষেপে যায়। কিন্তু ইসহাক কিভাবে প্রমাণ করবেন! বাধ্য হয়ে তিনি চলে যান। এভাবে মতিঝিল এলাকার প্রায় সব পাম্প থেকেই তেল কিনে প্রতারিত হচ্ছেন বলে জানালেন বশির নামে এক বাইকার। কিন্তু প্রমাণতো দিতে পারছেন না। তার কাছে তো পরিমাপকযন্ত্র নেই!
পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রমনা ফিলিং স্টেশনের কর্ণধার নাজমুল হক বলেন, সবক্ষেত্রেই চুরি-চামারি হচ্ছে। আমরাও এর বাইরে নয়। জবাবদিহিতার অভাব এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণেই মূলত সবক্ষেত্রে এই ধরনের দুর্নীতি জেঁকে বসে। এটি একটি দেশের অগ্রগতি ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজধানীতে যেসব পেট্রলপাম্পে নানা কৌশল অবলম্বন করে গ্রাহকদের তেল কম দেয়া হচ্ছে, বিএসটিআই অভিযান পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে যারা এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








