গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও স্বস্তি নেই শিল্পে সুফল নিয়ে উদ্যোক্তাদের নানা প্রশ্ন

শাহ আলম নূর

Advertisement

গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেই শিল্পের উৎপাদন বাড়বে বাস্তবে সব ক্ষেত্রে সেই হিসাব মিলছে না। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহের উন্নতির খবর এলেও শিল্পাঞ্চলভেদে গ্যাসের চাপ ও প্রাপ্যতার পার্থক্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী চালাতে পারছে না, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা। দেশের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সুফল শিল্পের কোন অংশে পৌঁছাচ্ছে, আর কোন এলাকায় ঘাটতি এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুরের ইসরাক স্পিনিং মিলসের দৈনিক ১৮০ টন সুতা উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ছিল ১৫ পিএসআই, অথচ তারা প্রায় ৩ পিএসআই চাপ পাচ্ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার উইজডম অ্যাটায়ার্স ও বাইজিদ নিট গার্মেন্টের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের তুলনায় কম গ্যাসচাপ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্য দিকে চট্টগ্রামসহ গাজীপুর, মাওনা, ভালুকা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ বাড়ার কথা বলা হয়। কিছু এলাকায় চাপ ১২ থেকে ১৫ পিএসআই পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সাভার, ধামরাই ও আশুলিয়ার কিছু এলাকায় ঘাটতি ও চাপের ওঠানামার কথাও উঠে আসে। অর্থাৎ সরবরাহ বাড়ানোর প্রভাব সব শিল্পাঞ্চলে একই সময়ে বা একই মাত্রায় পড়েনি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) নয়া দিগন্তকে বলেন, তৈরী পোশাক শিল্পের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপে গ্যাস পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কারখানাভেদে গ্যাসের চাপ ও প্রাপ্যতায় পার্থক্য থাকলে উৎপাদনে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যায়। তাই শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পিনিং, ডাইং, বস্ত্র, সিরামিক, কাচ ও ইস্পাতের মতো শিল্পে নির্দিষ্ট মাত্রার জ্বালানি ও স্থিতিশীল সরবরাহ প্রয়োজন। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বয়লার, তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র এবং অন্যান্য উৎপাদন সরঞ্জাম স্বাভাবিকভাবে চালানো কঠিন হয়। কখনো উৎপাদন কমাতে হয়, কখনো যন্ত্রপাতি চালানোর সময়সূচি বদলাতে হয়। এতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ কমে না; কাঁচামাল ব্যবহারের দক্ষতা, শ্রমিকদের কর্মপরিকল্পনা এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমাও প্রভাবিত হয়ে থাকে।
তারা বলছেন, সঙ্কট মোকাবেলায় বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে খরচের চাপ আরো বেড়ে যায়। ডিজেলচালিত জেনারেটর বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে গেলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ে। কিন্তু রফতানিমুখী শিল্পে ক্রেতার সাথে আগে থেকে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহের চুক্তি থাকায় বাড়তি খরচ সব সময় বিক্রয়মূল্যে যুক্ত করা যায় না। ফলে মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হতে পারে।
সাম্প্রতিক বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ কর্তৃক ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায় ৭৮ শতাংশ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। একই জরিপে ৫৫ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া আদেশ বাতিল হওয়া বা কমে যাওয়ার কথা জানায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জরিপের ফলাফল পুরো শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে জ্বালানি সঙ্কট যে উৎপাদন ও ক্রয়াদেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, তা বোঝার একটি প্রাসঙ্গিক সূচক।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন কারখানায় প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ নিশ্চিত হবে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন চলাকালে গ্যাসের চাপ কমে গেলে যন্ত্রপাতি সচল রাখা ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার হয় না এবং ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শিল্পের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গ্যাস বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। সাম্প্রতিক তৈরী পোশাক ও বস্ত্র খাতের চারটি সংগঠন শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছে।  সংগঠনগুলোর দেয়া তথ্যনুযায়ী তিতাস গ্যাসের আওতায় শিল্প ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে দৈনিক অনুমোদিত চাহিদা এক হাজার ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু দৈনিক ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের কথা থাকলেও প্রকৃত সরবরাহের গড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৮৩ দশমিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক ঘাটতি ৯৬ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সঙ্কট মোকাবেলায় শিল্প সংগঠনগুলো অঞ্চলভিত্তিক পর্যায়ক্রমিক সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে। এ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলে সপ্তাহের কয়েক দিন তুলনামূলক পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করে অন্য সময়ে সরবরাহ সীমিত রাখার ধারণা রয়েছে। তবে এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিল্পের ধরন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া বিবেচনায় নেয়া জরুরি। কিছু কারখানায় উৎপাদন মাঝপথে বন্ধ করলে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও পণ্যের ক্ষতি হতে পারে। তাই সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা এবং কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর সুফল পেতে হলে স্পিনিং, উইভিং, ডাইং ও ফিনিশিংসহ শিল্পের বিভিন্নপর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাসের চাপ ওঠানামা করলে উৎপাদনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা কমে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তৈরী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও রফতানি কার্যক্রমেও চাপ সৃষ্টি হয়। তাই সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাসের চাহিদা নিরূপণ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ কতটা বাড়ানো হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কতটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং তা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো যাচ্ছে কি না। গ্যাসের অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা, নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক ব্যয় নির্ধারণে সমস্যা হয়। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়, যা পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা এবং নিয়মিত চাপ বজায় রাখার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।