
জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে খবর, গান, নাটক ও খেলাধুলার ধারাভাষ্য শোনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও। সন্ধ্যা নামলেই পরিবারের সদস্যরা কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীরা একসাথে বসে বেতারের অনুষ্ঠান শুনতেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের খবর- সবকিছুর জন্য নির্ভরতা ছিল ছোট্ট এই যন্ত্রের ওপর। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরেও রেডিওর সেই কদর এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে যন্ত্রটি ক্রমেই হয়ে উঠছে অপরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রেডিওর উপস্থিতি ছিল। আশির দশকে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবেও রেডিও দেয়ার প্রচলন ছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, পল্লীগীতি, নাটক ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান শোনার জন্য শ্রোতারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। নির্দিষ্ট সময়ে প্রিয় অনুষ্ঠান শুনতে রেডিওর সামনে বসে থাকার সেই অভিজ্ঞতা এখন অনেকের কাছে নস্টালজিয়া।
হোসেনপুর সরকারি মডেল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক আব্দুল ওয়াদুদ মকসুদ বলেন, ‘ছাত্রজীবনে শীতের রোদে বাঁশের পাটি বিছিয়ে রেডিও শোনার অনুভূতি ভোলার মতো নয়। তখন খবর শুনতাম, পল্লীগীতি শুনতাম। এখন তো মোবাইলেই সবকিছু পাওয়া যায়।’
উপজেলার ধুলজুরি গ্রামের সাবেক প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জানার অন্যতম মাধ্যম ছিল রেডিও। একসময় সহজলভ্য এই যন্ত্রটি প্রায় প্রতিটি ঘরেই জায়গা করে নিয়েছিল। এখন বাজারে রেডিও খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রেডিওর গুরুত্ব শুধু বিনোদনে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল এটি। দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচারেও বেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং জনসচেতনতা তৈরিতে রেডিওর অবদান রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে রেডিওর গুরুত্ব স্মরণে প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কো ২০১১ সালে দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে রেডিওর প্রচলিত ব্যবহার কমলেও সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে এর গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। অনেক দেশে এফএম রেডিও, অনলাইন সম্প্রচার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেতার অনুষ্ঠান এখনো প্রচারিত হচ্ছে।
হোসেনপুরের প্রবীণদের স্মৃতিতে রেডিও তাই কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি একসময়কার পারিবারিক আড্ডা, বিনোদন ও তথ্য জানার অভিন্ন মাধ্যম। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে সেই অভ্যাস হারিয়ে গেলেও পুরনো রেডিওগুলো কোথাও শোকেজে, কোথাও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে- একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব যন্ত্র হয়তো একদিন ইতিহাসের উপকরণ হয়ে উঠবে; কিন্তু প্রবীণদের স্মৃতিতে রেডিও বেঁচে থাকবে সোনালি দিনের সঙ্গী হিসেবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








