ব্যাটিংয়ের অধঃপতন, দায় নেবে কে?

জসিম উদ্দিন রানা
একসময় ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে সমীহ করত প্রতিপক্ষ, এখন কেন এমন অসহায় আত্মসমর্পণ!
ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ ছিল কঠিন প্রতিপক্ষের নাম। ঘরের মাঠে তো বটেই, বিদেশের মাটিতেও টাইগারদের বিপক্ষে নামার আগে হিসাব কষতে হতো বড় দলগুলোকে। ব্যাটিংয়ে তামিম ইকবাল, লিটন দাস, মুশফিকুর রহীম, সাকিব আল হাসান কিংবা মাহমুদুল্লাহর মতো ক্রিকেটাররা ছিলেন ভরসার প্রতীক। অভিজ্ঞতা, ধৈর্য আর পরিস্থিতি বুঝে খেলার ক্ষমতা- এই তিনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিল ওয়ানডেতে আলাদা পরিচয়। সেই দলই এখন ব্যাট হাতে এমন অসহায়, যেন প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে দাঁড়ানোর সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে! প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ কী হলো বাংলাদেশের?
 ব্যাটিংয়ের এই দৈন্যদশার দায় কার?
সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানের বড় হার সেই প্রশ্নকে আরো জোরালো করেছে। ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৭২ রানে, ৩৩.৪ ওভারে। অর্থাৎ হাতে উইকেট রেখে পরিকল্পিতভাবে ম্যাচ শেষ করার বদলে মাঝপথেই কার্যত আত্মসমর্পণ করেছে দল। বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদও স্বীকার করেছেন, ২৭০ রানের লক্ষ্যটি তাড়া করা সম্ভব ছিল; কিন্তু ব্যাটাররা নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তার ভাষায়, একটি জুটি পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেনি দল। 
পরিসংখ্যান যখন বিপর্যয়ের সাক্ষী
বাংলাদেশের ব্যাটিং সমস্যাটি যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৪০ বা তার বেশি রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে সর্বশেষ ১০ ইনিংসের আটটিতেই ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এটি কেবল হার- জিতের হিসাব নয়; এটি দলের রান তাড়া করার সামর্থ্য, চাপ সামলানোর দক্ষতা এবং ব্যাটিং পরিকল্পনার গভীর সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি।
চলতি বছরের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রথম ম্যাচে ১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে ২৪৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে একসময় ১২২ রানে দুই উইকেট হারিয়েছিল দল। সেখান থেকে শেষ আট উইকেটে যোগ হয়েছে মাত্র ১১২ রান। ২৩৪ রানে থেমে গিয়ে হারতে হয়েছে ১৩ রানে। অথচ ৩৭তম ওভারে তিন উইকেটে ১৬৯ রান তুলে জয় অনেকটাই নাগালে ছিল।
এরও আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বো ওয়ানডেতে এক উইকেটে ১০০ রান থেকে ১০৫ রানে আট উইকেটে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের স্কোর। শেষ সাত উইকেটের পতন হয়েছিল মাত্র পাঁচ রানের ব্যবধানে! ২৪৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দল থেমেছিল ১৬৭ রানে। ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ব্যাটিং ধস হিসেবে ঘটনাটি জায়গা করে নেয়।
দায় কি শুধু ব্যাটারদের?
ব্যাটারদের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগ পেলেই যে রান করা যায় না, সেটি এখন বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই ভুল বারবার হচ্ছে কেন? একজন ব্যাটার আউট হতে পারেন, দু’জন ব্যর্থ হতে পারেন; কিন্তু ধারাবাহিকভাবে পুরো ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়লে সেটিকে আর নিছক ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলার সুযোগ থাকে না।
টপঅর্ডারের দায়িত্ব ইনিংসের ভিত গড়ে দেয়া। মিডল অর্ডারের কাজ সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়া। আর শেষের ব্যাটারদের দায়িত্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী রান বাড়ানো। বাংলাদেশে যেন তিনটি বিভাগেরই সমন্বয় হারিয়েছে। উইকেট পড়তে শুরু করলেই বদলে যাচ্ছে ব্যাটিংয়ের ভাষা। কেউ অযথা তাড়াহুড়ো করছেন, কেউ আবার চাপের মুখে নিজের স্বাভাবিক খেলাটুকুও ভুলে যাচ্ছেন। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ঝুঁকি নেয়া কিংবা প্রতিপক্ষের বোলিং পরিকল্পনার পাল্টা জবাব দেয়ার দক্ষতার ঘাটতিও স্পষ্ট।
লিটন দাসের অনুপস্থিতি অবশ্যই দলের জন্য ধাক্কা। কিন্তু একজন ক্রিকেটারের অনুপস্থিতিকে পুরো ব্যাটিং বিপর্যয়ের অজুহাত বানানো যায় না। একটি আন্তর্জাতিক দলের শক্তি তার সম্মিলিত সামর্থ্য।ে একজন নেই তো আরেকজন দায়িত্ব নেবেন- এটিই পেশাদার ক্রিকেটের নিয়ম।
নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের দায় কোথায়?
দায় এড়াতে পারেন না নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টও। কোন ব্যাটার কোন পজিশনে খেলবেন, কার দায়িত্ব কী, কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে রান তুলতে হবে- এসবের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। প্রতিটি সিরিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকলে ব্যাটারদের ভূমিকায় স্থিরতা আসবে কিভাবে? আবার ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি সমস্যার গভীরে না গিয়ে কেবল পরবর্তী ম্যাচে ভালো করার আশ্বাস দেয়া হয়, তাহলে পরিবর্তন আসবে কোথা থেকে?
ঘরোয়া ক্রিকেটের দিকেও তাকাতে হবে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ কিংবা অন্যান্য প্রতিযোগিতায় রান করলেই একজন ব্যাটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান না। চাপের মুখে ব্যাটিং, ইনিংস নির্মাণ, উইকেট ধরে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জেতানোর মানসিকতা- এসবের পরীক্ষাও জরুরি। নির্বাচকদের দেখতে হবে, কে শুধু রান করছেন আর কে দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটিং করতে পারছেন।
সমাধান বক্তৃতায় নয়, মাঠে
বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অতীতের সাফল্য দিয়ে বর্তমানের ব্যর্থতা ঢাকার সুযোগ নেই। একসময় বড় দলগুলো বাংলাদেশকে সমীহ করত- সেটি ছিল মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে, নামের কারণে নয়। সেই সম্মান ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাটারদের আগে ফিরতে হবে দায়িত্ববোধে, টিম ম্যানেজমেন্টকে ফিরতে হবে সুস্পষ্ট পরিকল্পনায়, আর নির্বাচকদের নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত।
প্রশ্নটি তাই শুধু ব্যাটাররা রান করছেন না কেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যাটিংয়ের এই ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে এত দিনেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া গেল না কেন?
জবাবদিহি চাই সবার। ব্যাটারদের কাছে চাই রান, কোচদের কাছে চাই কার্যকর পরিকল্পনা, নির্বাচকদের কাছে চাই দূরদর্শিতা। কারণ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হার নতুন কিছু নয়; কিন্তু বারবার একইভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
টাইগারদের আবারও প্রতিপক্ষের সমীহ আদায় করতে হবে। আর সে জন্য প্রথমেই ফিরিয়ে আনতে হবে ব্যাট হাতে লড়াই করার সাহস। কিন্তু বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা শুধু শেষ ম্যাচে জয় পাওয়া নয়; বরং একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা। বোলাররা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলবেন, আর ব্যাটসম্যানরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন না- এমন ক্রিকেট দিয়ে বড় দল হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হার তাই কেবল পয়েন্ট হারানোর ঘটনা নয়, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দীর্ঘ দিনের সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার তাগিদও। এখন দেখার বিষয়, শেষ ম্যাচে সেই তাগিদ বাস্তব পারফরম্যান্সে রূপ নিতে পারে কি না।
বাংলাদেশের পরের ম্যাচ ২১ অক্টোবর, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। সিরিজে ফাইনালে খেলা সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে সেখানে যেতেই হবে তাদের।

Advertisement