
অস্ত্র হাতে অভিযান
- আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে আইনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা : ডিবি প্রধান
- এমপি বা মন্ত্রী এ ধরনের অভিযান চালাতে পারেন না : মনজিল মোরসেদ
- নিরপেক্ষ তদন্তে আইনগত বৈধতা নির্ধারণ জরুরি : ড. তৌহিদুল হক
- আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি : ব্যারিস্টার ওমর ফারুক
রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ। ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তের পর আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত শনিবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযানের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন। এতে তাকে ও তার সহযোগীদের প্রকাশ্য দিবালকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। আইনজ্ঞদের কেউ এ ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ মাদকবিরোধী উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নির্মূলে জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ ইতিবাচক। মাদক কারবারের কারণে কোনো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের অংশ। তবে উদ্দেশ্য ভালো হলেও আইন প্রয়োগের নির্ধারিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ ঘটনায় অস্ত্রের লাইসেন্স ও ব্যবহারের পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, কোনো সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না। তাদের কাজ অভিযানের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া বা পরিকল্পনায় সহায়তা করা। অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পুলিশের। প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে তিনি বলেন, অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত থাকে। এ ধরনের অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের জন্য কাউকে লাইসেন্স দেয়া হয় না।
তবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার ওমর ফারুকের মতে, এ ঘটনায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। তার ভাষ্য, মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সমালোচনার আগে অভিযানের ইতিবাচক দিক বিবেচনা করা উচিত।
ওমর ফারুক বলেন, অস্ত্র আইনে কাউকে ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টি রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছেন ঠিকই, কিন্তু এতে কোনো সাধারণ নাগরিক ভীত হয়েছেন- এমন অভিযোগ আছে কি না, তা দেখতে হবে। তার দাবি, অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি এবং আটক ব্যক্তিদের আইনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তাই তার মতে, এ ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন ওঠে না।
একজন জনপ্রতিনিধিকে নিজে মাঠে নেমে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে হওয়াকে দেশে আইনের শাসনের ঘাটতির লক্ষণ বলে মনে করেন ওমর ফারুক। তার অভিযোগ, মাদক কারবার বন্ধে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না; কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রেললাইন-সংলগ্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা দীর্ঘ দিনের হলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে ওমর ফারুক বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে দিতে সহযোগিতা করা নাগরিকের দায়িত্ব। তার মতে, অস্ত্র ব্যবহার না করে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালালে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। মাদকের বিস্তার নতুন প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগের সমালোচনা করা গেলেও ভালো কাজের স্বীকৃতিও দেয়া প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই আইনজীবী। তার মতে, মাদক কেনাবেচা বন্ধে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো এলাকায় মাদক কারবার চললে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহযোগিতা দেয়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, কারো দিকে অস্ত্র তাক করা কিংবা বলপ্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করে ঘটনার পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার আইনগত দিক নির্ধারণ করা জরুরি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষ ভূমিকা রাখতে পারলেও তা আইন নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারায় এ-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, মন্ত্রীদের দায়িত্ব নির্দেশনা দেয়া; সরাসরি অভিযানে অংশ নিয়ে বলপ্রয়োগ করা নয়। বৈধ বা অবৈধ- যে ধরনের অস্ত্রই হোক, কারো দিকে তা তাক করা অপরাধ হতে পারে। প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শনকে বেআইনি উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনপ্রতিনিধিকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের দায়িত্ব কী?
প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানের সমালোচনা করেছেন মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিসও। নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বন্দুক হাতে রাস্তায় লোকজনকে ধাওয়া করা একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, গত শনিবার বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তারা সেখানে যান। স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল, তবে সদস্যরা পৌঁছাতে দেরি করেন।
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ছয়জনকে আটক করে থানায় ফোন দেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। সেগুলো হেরোইন কি না, পরীক্ষার পর তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি দেখানো, প্রদর্শনীবাজি বা হয়রানি করা নিষিদ্ধ। তবে এ ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত, অস্ত্র প্রদর্শনের পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য আইনের বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








