চেয়ারম্যানের পর একের পর এক পিএসসি সদস্যের ‘চা বিদায়’

বিশেষ সংবাদদাতা
 বৈঠক হয় না কমিশনের ৫০তম বিসিএসের ফল তৈরি থাকলেও প্রকাশ করা হচ্ছে না, বছরে এক বিসিএস এখন সুদূরপরাহত

Advertisement

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ধারাবাহিক পদত্যাগ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের একের পর এক পদত্যাগের পেছনে সরকারের চাপ ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ দুই সদস্যের পদত্যাগ এবং আরো কয়েকজন সদস্যকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চায়ের আমন্ত্রণে ডেকে পাঠানোর খবর এই বিতর্ককে আরো জোরালো করেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিকে কি ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের পছন্দমতো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে? সরকারের রাজনৈতিক সমর্থক না হলে কি ক্যাডার সার্ভিসে মেধাবীদের জন্য  নিয়োগ পাওয়ার দ্বার বন্ধ হয়ে যাবে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করতে হয়। এরপর কমিশনের সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন গত ১৫ অক্টোবর এবং অধ্যাপক সোহেলুর রহমান গত ১৭ অক্টোবর পদত্যাগ করেন। এই তিনজনের পদত্যাগের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, আরো দুই সদস্য একই ধরনের চায়ের আমন্ত্রণের তালিকায় রয়েছেন।
সূত্র আরো জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. আবদুল বারী তাদের সাথে দেখা করে পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনার কথা জানান। তবে পদত্যাগ করে চলে যাওয়া সদস্যদের কেউ এ ব্যাপারে মুখ খুলেননি; ব্যক্তিগত, স্বাস্থ্যগত কারণ কিংবা অধ্যাপনায় ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষার কথাই বলেছেন তারা। সে একইভাবে কমিশনের আরো কয়েকজন সদস্যকে তার সাথে চা পানের জন্য দেখা করতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রণালয় কিংবা পদত্যাগকারী ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও নিকটজনদের কাছে তারা বিষয়টি খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
২০ সদস্যের কমিশনে নিয়োগের হিসাব
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পিএসসির মোট সদস্যসংখ্যা ২০। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন ১৬ জন এবং বর্তমান সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন চারজন। পদত্যাগকারী তিনজনই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। যাদের পদত্যাগের জন্য ডাকা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তারাও ওই সরকারের সময়ই নিয়োগ পেয়েছিলেন।
এই ধারাবাহিকতার কারণে কমিশনের সদস্য রদবদলকে নিছক ‘ব্যক্তিগত পদত্যাগ’ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে-নতুন সরকার কি কমিশনের নেতৃত্ব ও সদস্যকাঠামোয় নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিতে চাইছে এবং বিসিএস কর্মকর্তা নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে?
তবে শুধু নিয়োগের সময়কাল বা পদত্যাগের ধারাবাহিকতা দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না। সদস্যদের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ, তাদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না এবং নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে- এসব বিষয় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের নিয়োগে পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। যদিও সেই সময়ে সরকারি বা সাংবিধানিক পদে বড় একটি অংশের নিয়োগ ছিল সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে এবং যাদের বেশির ভাগ বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের এখতিয়ার কতটুকু?
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সংবিধানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য যোগ্যতা যাচাই, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণ এবং নিয়োগের সুপারিশ করার ক্ষেত্রে কমিশনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধানের ১৩৭ থেকে ১৪১ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মকমিশন গঠন, সদস্য নিয়োগ, দায়িত্ব ও কার্যাবলি এবং কমিশনের প্রতিবেদনসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। সংবিধানের ১৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেন। ১৩৯ অনুচ্ছেদে তাদের মেয়াদ এবং পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
ফলে চেয়ারম্যান বা সদস্যদের পদত্যাগের বিষয়টি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আইনগত অবস্থান এবং প্রযোজ্য সাংবিধানিক বিধানের আলোকে বিবেচনা করা উচিত। সরকার প্রশাসনিকভাবে কোনো সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারে কি না, কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পদত্যাগ করানো হলে তার আইনগত বৈধতা কতটুকু- তা নিয়ে আইনি বিতর্ক উঠতে পারে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের ওপর অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার হরণ নয়, প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও বড় প্রশ্ন তুলবে।
মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
পিএসসির সদস্য পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কের প্রভাব বিসিএসসহ পুরো সরকারি নিয়োগব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে পরীক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের পর কমিশনের সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় বা নিয়োগের সময়কাল যদি পদে থাকার প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার নীতি দুর্বল হয়ে পড়বে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো নিয়োগ ও পদত্যাগের প্রতিটি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা, সদস্যদের স্বাধীন অবস্থান নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদ পরিবর্তনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়া। একই সাথে পদত্যাগকারী সদস্যদেরও তাদের সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ প্রকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
বছরে এক বিসিএসের আশা সুদূরপরাহত
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পিএসসি পুনর্গঠনের পর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়মিত করা এবং বছরে একটি বিসিএস ব্যাচের নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়। ওই সময়ে বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণের নির্ধারিত তারিখের আগেই প্রকাশের রেকর্ড তৈরি হয়। সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার নিয়োগের দ্রুত ও কার্যকর মডেলকে সামনে রেখে বলা হয়েছিল- সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত কঠোর ও বহুধাপের পরীক্ষার পরও যদি বছরে দু’টি ব্যাচ অফিসার নিয়োগ করা সম্ভব হয়, তবে সিভিল সার্ভিসে বছরে একটি বিসিএস কেন সম্ভব হবে না? এই হিসাব ধরে ১০ মাসের মধ্যে পরীক্ষার সব ধাপ সম্পন্ন করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ এবং ১ বছরের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।
তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সেই গতি আর বজায় থাকেনি। হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষ হওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান ফল প্রকাশ করতে দিচ্ছেন না। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেয়ার নজির স্থাপন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি মাত্র একবার কমিশনের বৈঠক ডেকেছেন বলে জানা গেছে।
প্রশ্নের মুখে সরকারের ভূমিকা
পিএসসির চেয়ারম্যানসহ তিন সদস্যের পদত্যাগ এবং আরো সদস্যদের ডেকে পাঠানোর অভিযোগের পর সরকারের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে : পদত্যাগকারীরা কি সত্যিই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, নাকি তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যদেরই কেন বেছে বেছে পদত্যাগের জন্য ডাকা হচ্ছে? নতুন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার ঠিক কী মানদণ্ড অনুসরণ করবে?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না মিললে কমিশনকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠন ও দলীয়করণের আশঙ্কা আরো জোরালো হবে।
সরকার বদলালেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও পেশাগত ধারাবাহিকতা বদলে যাবে- এমন দৃষ্টান্ত তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো। তাই পিএসসির বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন শুধু ‘কারা পদত্যাগ করছেন’ তা নয়; বরং কমিশনের স্বাধীনতা অক্ষুণœ রেখে মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা কীভাবে সুনিশ্চিত করা হবে- সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
রিটায়ার্ড বিসিএস অফিসার্স প্ল্যাটফর্মের (আরপিও) সহ-সভাপতি ও সাবেক সচিব ড. শরিফুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চা পানের দাওয়াত দিয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা সদস্যদের বিদায় করা একটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক সঙ্কেত। এটি লাখ লাখ মেধাবী তরুণের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেবে এবং জুলাই বিপ্লবে তরুণরা যে স্বপ্ন নিয়ে রক্ত দিয়েছিল, সেটিকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করবে।’ তিনি ক্যাডার সার্ভিসে সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগে কোনো ধরনের দলীয়করণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি জোর আহ্বান জানান।