বিএনপি

 

Advertisement

গত ১৫ অক্টোবর মাগুরার শালিখায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই দিন চট্টগ্রামে একটি প্রতিনিধি সভা শেষে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে ছুরিকাহত হন আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির চৌধুরী আনসার ও দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম খোকা। গত ১০ মার্চ সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় কয়লা-পাথর পরিবহনের ট্রাক-লরিতে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নিহত হন এক ব্যক্তি। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ ১৯ এপ্রিল রাতে বাসায় ভাত  খাচ্ছিলেন। বাসার ভেতর ঢুকেই অস্ত্রধারীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। মানিকের পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, নিজ দলের প্রতিপক্ষ তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। 
শুধু এই কয়েকটি স্থানেই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলীয় অন্তর্কোন্দলের জেরে রাজনীতির মাঠে ঝরছে রক্ত, প্রাণ হারাচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ লোকজন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরের বিশ্লেষণ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে বেরিয়ে এসেছে এমন চিত্র। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক মতবিরোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন, আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি, বাজার-ইজারা ও আর্থিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে সহিংসতার এই চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসঙ্কেত। তার মতে, এ ধরনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিএনপির সাংগঠনিক ঘাটতি রয়েছে। যদিও আলোচিত কিছু ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে তা তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট বার্তা দিতে পারছে না। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অতীতের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো সংযমী ও সহনশীল হতে হবে, নইলে সহিংসতা আরো বাড়তে পারে। তার মতে, শুধু বহিষ্কার করলেই হবে না, জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। 
মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসে সারা দেশে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলের এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১২২৭ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। মোট ১৮৩টি সহিংসতার ঘটনার ১৬১টিই অর্থাৎ ৮৮ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল এবং বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। এ ছাড়া, নিহত ১৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৯ জন (৫৩ শতাংশ), জামায়াতের দু’জন, আওয়ামী লীগের তিনজন এবং অন্য তিনজন রয়েছে।  
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৬৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৪০ জন ও নিহত ৯ জন। সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে বলা হয়, সহিংসতার ঘটনার ৮৮ শতাংশ ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৫৩ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলদারিত্ব এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। 
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কেননা এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে সংঘটিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাথে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীরাই জড়িত। তার দাবি, বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকেই এসব সহিংসতার বড় অংশের জন্ম হচ্ছে এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। 
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঠিকই, তবে সব ঘটনাকে রাজনৈতিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, ক্ষমতায় গেলে নানা সুযোগসন্ধানী লোক দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তবে অভিযোগের সত্যতা মিললে সাংগঠনিকভাবে কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।
সংঘাতের কারণে নানা সময়ে ব্যবস্থা নেয়ার পরও বিএনপির পক্ষ থেকে অন্তর্কোন্দলের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান ও গণমাধ্যমে আসা তথ্যের বরাতে এ ধরনের অন্তর্কোন্দলের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, এই পরিসংখ্যান বা প্রতিবেদন আমাদের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে। এ ধরনের যেসব অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে, সেগুলো অনুসন্ধান করে যারা প্রকৃত দোষী, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।  
রাজনৈতিক কোন্দলে হানাহানি এবং প্রাণহানির বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক ইনামুল সাগর গণমাধ্যমে বলেন, যারাই অপরাধ করুক না কেন আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আইনের আওতায় আনতে সচেষ্ট ভূমিকা রাখছি। এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে, আসামি ধরা হচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের যা করণীয় তাই করা হচ্ছে। 
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, নিজের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দল নতুন নাটক শুরু করেছে। দেশ যখন নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন গঠনমূলক ভূমিকা না রেখে বিরোধীরা জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে। তিনি বলেন, কোনো অন্যায় পার পাবে না। সংঘাত ও হত্যার রাজত্ব এ দেশে আর হতে দেয়া হবে না। আইন ও আদালতের মাধ্যমে সব অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
চলতি বছরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনেরও বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থা ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং পারিবারিক অস্থিরতার কারণে এ ধরনের নৃশংস খুনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। 
জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এক রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী হাসিনাকে এ দেশ থেকে তাড়িয়েছি। হাজারো ছাত্র-জনতার রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে দেশ আজ ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আজ আমাদের দেখতে হচ্ছে, যে আকাক্সক্ষা নিয়ে এ দেশের মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, সেই শহীদদের রক্তের সাথে আজ বেইমানি করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আজ দেশের আনাচে-কানাচে কী দেখছি আমরা? স্বৈরাচারের পতনের পর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন, দখল ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিএনপিকে আজ এমন এক ভূতে ধরেছে, যে ভূত একসময় শেখ হাসিনাকে গ্রাস করেছিল। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে শেখ হাসিনা যেভাবে জনগণের ওপর জুলুম করেছিল, ঠিক একই কায়দায় আজ দেশের বহু জায়গায় দখলদারিত্ব আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা মনে করেছিলাম, স্বৈরাচারের পতন থেকে রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা নেবে। কিন্তু সরকারি দল সেই শিক্ষা নেয়নি। তিনি বলেন, আবার সেই পুরনো স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালাতে চাইলে এ দেশের তৌহিদী জনতা ও ছাত্রসমাজ তা বরদাশত করবে না। 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটি আওয়ামী লীগের শাসনামলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর দলটি স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে আসে। তবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশের কোনো কোনো এলাকায় নিজেদের মধ্যে নানা স্বার্থের সংঘাত দেখা দেয়। যদিও দলটির হাইকমান্ড এসব সংঘাত-সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কারসহ নানা ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু দলীয় ব্যবস্থা নিলেই হবে না, জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখী করতে হবে।