শর্ত মানলে ৭ দিনেই হরমুজ খুলবে ইরান

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া ইরানের প্রস্তাব এখনো টেবিলে বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। গতকাল রোববার দেশটির সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ওই প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের।
অন্তর্বর্তীকালীন এক যুদ্ধবিরতি বিফলে যাওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইরান ওই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার জন্য ইরানের দেয়া সাতটি শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে বলে গত সপ্তাহে জানান তেহরানের নিরাপত্তা প্রধান।
অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) বৈঠকে যোগ দিতে বাগদাদে অবস্থানকালে আরাকচি বলেছিলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে যে সাত দিনের প্রস্তাব দিয়েছি, তার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের অবস্থান পরিষ্কার এবং নির্ধারিত। তারা তাদের মতামত জানিয়েছে, যা আমরা পর্যালোচনা করছি। তবে আমাদের প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যদি বিন্দুমাত্র সততা থাকে, যেটি আসলে নেই, তাহলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার পথ একেবারেই স্পষ্ট।’ ইরানের দেয়া শর্তগুলোর মধ্যে অন্যান্য দাবির পাশাপাশি রয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, দেশটির জ্বালানি তেল রফতানির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং আঞ্চলিক সমস্ত ফ্রন্টে বৈরিতা বন্ধ করা। আরাকচি বলেন, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের শর্তগুলো মেনে নেয়, তাহলে ছয় দিনের মধ্যে প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেয়া সম্ভব এবং এর পরদিনই পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হতে পারে। 
তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের কারণেই হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, যার অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে। একই সাথে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি উত্তেজনা কমাতে কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথা জানান তিনি। ইয়েমেন সঙ্কট নিয়ে আরাকচি বলেন, সামরিক শক্তি বা অবরোধ দিয়ে এ সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। জাতিসঙ্ঘ সনদের আলোকে ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জনগণের মানবাধিকার সমুন্নত রেখে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে ইরান সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। শুরু থেকেই দুই দেশের মধ্যে বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার জেদ। চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণ এবং দুই দেশের আট মাসব্যাপী চলা এ যুদ্ধ অবসানে ইরানকে অবশ্যই তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে হবে। তবে তেহরান বলেছে, আলোচনার শুরুতেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা এবং সমুদ্রপথটিতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরানের কাছ থেকে যাচাইযোগ্য অঙ্গীকার চায় যুক্তরাষ্ট্র 
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছু দিক থেকে নির্ণায়কভাবে জয়ী’ হয়েছে এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ইরান যাতে আবারো পরমাণু কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে দেশটির কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও যাচাইযোগ্য অঙ্গীকার চায় ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ আয়োজিত এক টাউন হল অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ভ্যান্স। খবর আলজাজিরার। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদেই শুধু নয়, আগামী পাঁচ বছর বা তার পরেও ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। ভ্যান্স বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মেয়াদে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এখন থেকে পাঁচ বছর পর ইরানিরা কি আবারো পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারবে? তারা কি আবার ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারবে?’ তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সাফল্যের দাবি করলেও ভবিষ্যতে দেশটি যাতে সে সক্ষমতা আবার অর্জন করতে না পারে, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা চায় ওয়াশিংটন।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণার মতো বেসামরিক প্রয়োজনে পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটন ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে চায়। অন্য দিকে, তেহরান তার বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির অধিকার বজায় রাখার বিষয়ে অনড়। 
ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর ক্ষতি সাধনেই সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতে দেশটির পরমাণু সক্ষমতা পুনর্গঠনের পথ বন্ধ করতেও দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা চায় ট্রাম্প প্রশাসন। তবে ইরান এ ধরনের কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও যাচাইযোগ্য অঙ্গীকার দিতে সম্মত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ভ্যান্সের বক্তব্যে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। একইভাবে, এ ধরনের অঙ্গীকার কিভাবে যাচাই করা হবে বা তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে, সেটিও স্পষ্ট করেননি তিনি। 
নতুন আগ্রাসনে আরো কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে আগের ১২ ও ৪০ দিনের যুদ্ধের জবাবের চেয়েও ভয়াবহ পাল্টা পরিকল্পনা নিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বারবার হুমকিতে বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। শত্রুপক্ষের পরিচিত কৌশল অনুসরণ না করেই ইরানের নতুন সামরিক পরিকল্পনা পরিচালিত হবে বলেও দাবি করেন তিনি। এ দিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ আগ্রাসী দেশগুলোর বাড়াবাড়ির কাছে মাথা নত করবে না। এক বৈঠকে তিনি বলেন, ইরান অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ডের প্রতি লোভ রাখে না। শত্রুদেরও ইরানের ভূখণ্ডের দিকে লোভী দৃষ্টি দিতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো মনে করে চাপের মুখে আমাদের নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা যাবে, কিন্তু আমরা কোনো ধরনের জবরদস্তির কাছে মাথা নত করব না।’ এ সময় তিনি তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘অযৌক্তিক ও অমানবিক’ বলে অভিহিত করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে কেন?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা বারবার ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ শুধু শর্তের বিরোধ নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি দু’টি মানসিক জট কূটনৈতিক সমঝোতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক দিকে, ইরানের কাছ থেকে আগে পদক্ষেপ ও তার যাচাই চায় ওয়াশিংটন। অন্য দিকে, ইরান কোনো ছাড় দেয়ার আগে মার্কিন নিশ্চয়তা ও চাপ প্রত্যাহার চায়। আলজাজিরার মতামত কলাম থেকে জানা যায়, এ অবিশ্বাসের শিকড় ১৯৫৩ সালে। ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণের পর প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভূমিকা রাখে। এতে ইরানের রাজনৈতিক চেতনায় ধারণা তৈরি হয়, স্বাধীন সরকার মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে ওয়াশিংটন তাকে উৎখাতের চেষ্টা করবে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং ৫২ মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন অবরোধ করে রাখার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইরানকে অবিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অন্য দিকে, ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা তেহরানের অবিশ্বাস আরো বাড়ায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তখন ইরানের চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং চলমান যুদ্ধে ইসরাইলের সাথে ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণ তেহরানের এ ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে-মার্কিন প্রতিশ্রুতি যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। সাম্প্রতিক প্রস্তাবগুলোতেও এ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র আগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার দাবি জানায়। ইরান চায়, আগে নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যৎ হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হোক। ইসলামাবাদে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক দুই পক্ষের উদ্বেগ বিবেচনায় নেয়ায় সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছে ছিল। কিন্তু লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হওয়ায় আলোচনা ভেঙে পড়ে। ফলে দুই দেশের মধ্যে শর্তের ব্যবধান কমলেও আস্থার সঙ্কট কাটেনি। তাই কেবল আলোচনার ধাপ নির্ধারণ যথেষ্ট নয়; উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি ও পাল্টা পদক্ষেপ একসাথে নিশ্চিত করতে পারে-এমন নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।