
নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির পর সেগুলোর ব্যবহার, সংরক্ষণ ও রফতানির হিসাব নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তৈরী পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান উইলিয়ামস সোয়েটার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা ৫২ হাজার ৭৮৫ কেজি ওভেন ফ্যাব্রিক্সের বিপরীতে কোনো রফতানির রেকর্ড দেখাতে পারেনি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। একই সাথে ২০২৩ সালে সিপিসি সুবিধায় আমদানি করা ৫২৫টি যন্ত্রপাতির একটিও কারখানায় স্থাপিত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে এনবিআর মনে করছে। গতকাল (রবিবার) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রিজভী আহমেদ এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী উইলিয়ামস সোয়েটার্সের আমদানি করা ৫২ হাজার ৭৮৫ কেজি ওভেন ফ্যাব্রিক্সের বিপরীতে এক কোটি ৯৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯ টাকার রাজস্ব জড়িত। অন্যদিকে, সিপিসি সুবিধায় আমদানি করা ৫২৫টি যন্ত্রপাতির বিপরীতে প্রাথমিকভাবে ১১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকার রাজস্ব জড়িত রয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা বলে তিনি জানান।
শুল্কমুক্ত বা বিশেষ সুবিধায় আমদানি করা পণ্য নির্ধারিত উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে ব্যবহার না হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি বন্ড ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রফতানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমাতে বন্ড সুবিধা দেয়া হলেও এ সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির যথাযথ হিসাব এবং ব্যবহার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
রিজভী আহমেদ বলেন, অনুসন্ধানে উইলিয়ামস সোয়েটার্সের বিরুদ্ধে বন্ড ও বিনামূল্যে (ফ্রি অব কস্ট বা এফওসি) আমদানি করা কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের পক্ষ থেকে দাবি করে বলা হচ্ছে, আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত উৎপাদন ও রফতানির কাজে ব্যবহারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও আইনানুগ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্থাটির পৃথক প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীন ও ভারত থেকে তিনটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৩৭ দশমিক ০৮ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় দুই কোটি তিন লাখ টাকা। এর বিপরীতে নিরূপিত শুল্ক-কর প্রায় এক কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাঁচামাল নির্ধারিত উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে ব্যবহার না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে।
এনবিআর এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আমদানি করা ৩৭ দশমিক ০৮ টন কাঁচামালের হিসাব এবং ৫২ হাজার ৭৮৫ কেজি ওভেন ফ্যাব্রিক্সের হিসাব একই চালান বা একই অনুসন্ধান-পর্বের কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে এক কোটি ৩৪ লাখ টাকার শুল্ক-কর ঝুঁকি এবং প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার প্রাথমিক রাজস্ব হিসাবের মধ্যে কোনো পুনরাবৃত্তি রয়েছে কি না তা নিয়েও কাজ করছে এনবিআর।
সরজমিন অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড রেজিস্টার নির্ধারিত পরিদর্শনস্থলে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে অধিদফতর। এ ছাড়া আমদানি-রফতানির তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং আমদানি করা কাঁচামালের প্রকৃত অবস্থান ও ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ার মতো অসঙ্গতি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব তথ্যের ঘাটতির কারণে আমদানি করা পণ্য কোথায় ব্যবহার হয়েছে, কতটুকু উৎপাদনে গেছে এবং তার বিপরীতে রফতানি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উইলিয়ামস সোয়েটার্সের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এবং লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সাবকন্ট্রাকটিংয়ের মাধ্যমে কাজ করার কথা বললেও এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল সাধারণত নির্ধারিত শর্তে রফতানিমুখী পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারের কথা। এ সুবিধায় আমদানি করা পণ্য অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার বা বিক্রি করা হলে প্রযোজ্য শুল্ক-কর আদায়ের প্রশ্ন সামনে আসে। একইভাবে বিশেষ সুবিধায় আমদানি করা যন্ত্রপাতি কারখানায় স্থাপন ও ব্যবহারের শর্ত থাকলে সেগুলোর অবস্থান এবং ব্যবহার সম্পর্কে যথাযথ নথি থাকা প্রয়োজন।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানিয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফাঁকিকৃত শুল্ক-কর নিরূপণের হিসাবও চলমান রয়েছে। ফলে বর্তমান অনুসন্ধানে চিহ্নিত রাজস্ব ঝুঁকির বাইরেও অতীতের আমদানি, উৎপাদন, রফতানি এবং শুল্ক-কর পরিশোধের হিসাব যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে।
তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া অসঙ্গতি ও অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রাজস্ব ফাঁকি নির্ধারণ করা যায় না। আমদানি করা পণ্য কোথায় রয়েছে, যন্ত্রপাতি অন্য কোনো অনুমোদিত স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








