বিশ্বে বছরে মাথাপিছু ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট

 আলজাজিরা
বিশ্বজুড়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ, যেখানে উষ্ণ আবহাওয়ার সাথে হিমায়ন ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির ঘাটতিকে এই পরিস্থিতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশটিতে প্রতি ব্যক্তি বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার নষ্ট করে, যা বৈশ্বিক গড় অপচয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্যানুযায়ী, উষ্ণ জলবায়ুর দেশগুলোতে বাসাবাড়িতে খাদ্যদ্রব্য ফেলে দেয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। আধুনিক কোল্ড চেইন বা রেফ্রিজারেশন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং পচনশীল তাজা কৃষিপণ্যের অধিক ব্যবহারের কারণে এসব অঞ্চলে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তালিকার শীর্ষ ভাগে থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে সিরিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, সিশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়ায় বছরে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ২১০ কেজির বেশি। বিপরীত চিত্রে অবস্থান নেয়া স্পেনে মাথাপিছু এই অপচয় বছরে মাত্র ৩৯ কেজি বা তারও নিচে।
বিশ্বব্যাপী নষ্ট হওয়া খাদ্যের সবচেয়ে বড় অংশটির অপচয় ঘটে বাসাবাড়িতে, যা মোট পরিমাণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা খাতে ২৮ শতাংশ এবং খুচরা বিপণন কেন্দ্রগুলোতে ১২ শতাংশ খাবার ডাস্টবিনে যায়। সংস্থাটির হিসাবে, দোকানপাট ও গৃহস্থালি পর্যায়ে ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ১০৫ কোটি টন ফেলে দেয়া হয়। অন্যদিকে মাঠ থেকে বাজারে পৌঁছানোর আগেই প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাত ও পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে নষ্ট হয় মোট উৎপাদনের ১৩ শতাংশ খাদ্যশস্য ও শাকসবজি। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই বিনষ্ট হওয়া এই খাদ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার।
বিপুল পরিমাণ খাদ্য ভাগাড়ে গেলেও বিশ্বের এক বড় অংশের মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্যের সঙ্কটে রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের ‘স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ অনাহারের শিকার হয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে কেবল আফ্রিকার মহাদেশেই অপুষ্টিতে ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ, যা মোট বৈশ্বিক ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া এশিয়ায় ২৯ কোটি ২০ লাখ এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যহীনতার মধ্যে রয়েছে।
দেশভিত্তিক ক্ষুধা সূচকে মূল্যায়িত ১২২টি দেশের মধ্যে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আটটি দেশের সাতটিই আফ্রিকায়। তালিকায় সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে সোমালিয়া; এর পরের অবস্থানে ডিআর কঙ্গো, চাদ ও মাদাগাস্কার। সঙ্ঘাতের কারণে সুনির্দিষ্ট স্কোর নির্ধারণ করা না গেলেও সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনের পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
খাদ্য বিনষ্টের এই চক্র একই সাথে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জলবায়ুর ওপর গভীর চাপ তৈরি করছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, খাদ্য অপচয়ের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়। এ ছাড়া এমন খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর কৃষিজমি ব্যবহৃত হয়, যার আয়তন পুরো কানাডার চেয়েও বেশি। অপচয় হওয়া খাদ্য ও আবর্জনার স্তূপ থেকে নির্গত মিথেন গ্যাসসহ নষ্ট হওয়া খাবার থেকেই বিশ্বের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ উৎপন্ন হচ্ছে।

Advertisement