হাদি হত্যার বিচার চান সর্বস্তরের মানুষ

হাবিবুল বাশার 

Advertisement

‘জান দেবো, জুলাই দেবো না, দুর্নীতি আর ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যারা জেহাদ ঘোষণা করবে, তাদের হাতেই গড়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশ’- এমন হুংকার দেয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার বিচার চান সাধারণ মানুষ। মৃত্যুর প্রায় ১০ মাস পরও তার কবর জিয়ারত করতে সমাধিস্থলে আসছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তাদের অনেকেই হাদির স্মৃতি ও অবদানের কথা তুলে ধরে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।
এ দিকে কবি নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে দাফনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন,  এই বিতর্ক হাদির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও হত্যার বিচার নিয়ে আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর প্রশ্ন তোলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে হাদিকে সমাহিত করা উচিত হয়েছে কি না। ভবিষ্যতে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে জাতির জন্য হাদির অবদান কী, তা জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেন ‘হু ইজ হাদি?’ নূর বলেন, মৃত্যুর পর লাখ লাখ মানুষ তাকে দেখতে গেলেও জীবিত অবস্থায় তার পাশে কতজন ছিলেন, সেই প্রশ্ন রয়েছে। হাদি একটি জাগরণ তৈরি করেছেন- এটি স্বীকার করে তাকে আলাদাভাবে স্মরণ করার কথাও বলেন তিনি। তবে সুকান্ত বা নজরুলের মতো সাহিত্যকর্ম হাদির রয়েছে কি না- সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মানুষের আবেগ দিয়ে বাস্তবতা চলে না।
নুরের এ বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সামনে আসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হাদির ভূমিকা, তার রাজনৈতিক চিন্তা, জাতীয় কবির সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে প্রশ্ন।
‘নিজের দোষ ঢাকতে হাদিকে টানছেন ’: নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শিব্বির আহমেদ মনে করেন, নুরুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে নিতেই হাদিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, সম্প্রতি নুরের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে তার এক কর্মীর বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকার কমে কাজ না করার কথা বলার অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেফতার করা হয়। একই সময়ে ৫ আগস্টের পর বাড়ি দখল করে ভাড়া আদায়ের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। 
ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, এসব অভিযোগের কারণে নুরকে নিয়ে সমালোচনা বাড়ছিল। তার ধারণা, সেই আলোচনা অন্য দিকে সরিয়ে দিতেই নুর ওসমান হাদিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন। কারণ, তার সমালোচকদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং অন্যান্য ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর লোকজনসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ রয়েছেন। এসব গোষ্ঠীর কাছে হাদির বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় তাকে নিয়ে মন্তব্য করলে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। 
হাদির কবর নিয়ে যা বলছেন বিশ্লেষকরা : জাতীয় কবির সমাধির পাশে ওসমান হাদিকে দাফনের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, লেখক ও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন নয়া দিগন্তকে বলেন, নজরুলের পাশে হাদিকে সমাহিত করার বিষয়টি জুলাই আন্দোলনের আবেগের সাথে সম্পর্কিত ছিল। তবে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতার দায় তৎকালীন সরকারের ওপর বর্তায়। এ বিষয়ে এখনই কথা বলার সময় আসেনি উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা অনুধাবন করেই কাজ করবে।
অন্য দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, জীবনদর্শন এবং শোষণ, পরাধীনতা ও আধিপত্যবিরোধী অবস্থানের সাথে ওসমান হাদির চিন্তার মিল রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সমাধিস্থলে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সমাহিত করা হয়েছে। সেখানে একজনের পাশে অন্য জনের কবর থাকা মানেই তাদের অবদান, মর্যাদা বা ঐতিহাসিক অবস্থান সমান করে দেয়া নয়। প্রত্যেকের অবদান জনগণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবে। 
‘হাদি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক’ : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, শহীদ ওসমান হাদিকে হত্যার প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও হাজার-হাজার মানুষ তার হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথে অবস্থান করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অথচ কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ওসমান হাদি কে? তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মারা যাওয়ার তিন দিন পর তার খোঁজ নেয়ার মতো মানুষ থাকে কি না, তা ভেবে দেখা উচিত। জাবের বলেন, ওসমান হাদি বাংলাদেশের আজাদি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। দেশের যেসব মানুষ কথা বলতে পারেন না এবং যাদের কথা শোনার মতো রাষ্ট্রে কেউ নেই, হাদি ছিলেন তাদের কণ্ঠস্বর। হাদিকে নিয়ে কটূক্তি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাকে নিয়ে ফের কোনো ধরনের কটূক্তি করা হলে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে জবাব দেয়া হবে। 
গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন অনুষদের ডিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) অধ্যাপক ড. শেখ আকরাম আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন বিপ্লবের আবু সাঈদ ও মুগ্ধ যেমন- নায়ক, তেমনি বিপ্লবকে ধরে রেখে সফলতার দিকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ওসমান হাদি। হাদি সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। নতুন বাংলাদেশের আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক নায়ক। 
কবর জিয়ারতে আসছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ : ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসছেন মানুষ। কেউ দোয়া করছেন, কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের নিয়ে আসছেন তার কবর দেখাতে। সম্প্রতি ঢাকায় বেড়াতে এসে হাদির কবর জিয়ারত করেন সিলেট থেকে আসা দুই শিক্ষার্থী হাবিব ও জাহিদুল। তাদের একজন এমসি কলেজের শিক্ষার্থী এবং অন্যজন কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী। তারা জানান, ঢাকায় বেড়াতে এসে হাদি ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি জিয়ারত করার সিদ্ধান্ত নেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান বলেন, শরিফ ওসমান হাদি আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। জুলাই আন্দোলন অনেক নেতৃত্ব উপহার দিলেও হাদি রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তিনি মানুষের মুখের ভাষা, জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করতে চেয়েছেন। 
নারায়ণগঞ্জ থেকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে আসা গাড়িচালক আজিজুল হক খানও হাদির হত্যার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, আমার মা মারা গিয়েছিলেন, তখনো এতটা কষ্ট পাইনি, যতটা পেয়েছি- হাদি হত্যার ঘটনায়। ময়মনসিংহ থেকে আসা বেলাল হোসাইন বলেন, হাদি কয়েক প্রজন্মের মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরে তার ইচ্ছা ছিল হাদির কবর জিয়ারত করার। যারা হাদিকে নিয়ে সমালোচনা করেন, তাদের সন্তানদের জিজ্ঞেস করলেই হাদি সম্পর্কে জানা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বায়োকেমিস্ট্রিতে অধ্যয়নরত দুই বন্ধু জুবায়ের আবদুল্লাহ তালহা ও সাফওয়া সাদিকও হাদির কবর জিয়ারত করতে আসেন। জুবায়ের আবদুল্লাহ তালহা বলেন, যারা এখন হাদিকে নিয়ে কথা বলছেন, তাদের কেউ কেউ একসময় তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন এবং তার কফিন গ্রহণ করেছিলেন। এখন রাজনৈতিক কারণে নতুন করে অবস্থান নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। 
হত্যাকাণ্ড ও তদন্তের অগ্রগতি : রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জীবনের শেষ দিকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন হাদি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অন্তত ৩০টি ফোন নম্বর থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেয়ার তথ্য সামনে আসে। এসব হুমকির মধ্যেও তিনি রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হাদির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৩২ বছর।
মামলার তথ্যানুযায়ী, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীকে মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা, ফয়সাল করিম মাসুদকে সরাসরি গুলিবর্ষণকারী এবং আলমগীর শেখকে তার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
হাদির হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। হত্যার বিচার ও জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। একই সাথে রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তার প্রশ্নও আলোচনায় আসে। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় এ পর্যন্ত ২০ বার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত আগামী ৩ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে মামলাটির অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে আদালত আগামী ৩ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রুকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
‘বিচারের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার লক্ষণ দেখছি না’ : হাদিকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলেও তার হত্যার বিচার, তদন্তের অগ্রগতি এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি এখনো তার সমর্থক ও সাধারণ মানুষের বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ড. শিব্বির আহমেদ। বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতার স্পষ্ট লক্ষণ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ভারতের সাথে বৈঠকের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া একটি বক্তব্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার পাশাপাশি ওসমান হাদির হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই বক্তব্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটি সরকারের সামগ্রিক অবস্থান কি না- তা নিশ্চিত নন তিনি। ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, হত্যাকারীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুতে কথা বললেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি বা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নতুন কোনো বক্তব্য তার নজরে আসেনি। এ কারণে হাদি হত্যার বিচারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।