
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের আক্রমন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের অনেক অভ্যন্তরে থাকা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশীসহ অনেক দেশের নাগরিক হতাহত হয়েছে। মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের সব বিমানবন্দর, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ‘লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে হাউছি বিদ্রোহীরা। তারা ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সৌদি মদদপুষ্ট আন্তর্জাতিক সরকারের বাহিনীর ওপর সাঁড়াশি হামলা চালিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালী দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার সাথে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মামসহ কয়েকটি বিমানবন্দরে হাউছিদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকায় গতকাল পর্যন্ত ঢাকা থেকে ১১৪ ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে ১৭ হাজার ৭০১ যাত্রী আটকা পড়েছেন বলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। শনিবার বিকেলে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ঢাকা থেকে এ পর্যন্ত ৫০টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৬৪টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
সৌদি আরবের ওপর হাউছিদের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কিভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। কারণ মাত্র দুই মাস আগে গত ৭ আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এক দেশের ওপর আক্রমণকে সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এই চুক্তির খুঁটিনাটি ও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগের বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই চুক্তিটি সৌদি আরবকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এর মধ্যে হাউছিদের সামরিক ও আর্থিকভাবে সমর্থন দেয়া ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সৌদি আরব ইরানের মধ্যস্থতা মেনে নেবে কি না; তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক খেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও সক্রিয় রয়েছে।
নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেছেন, সৌদি আরবের একগুঁয়েমির কারণে হাউছি নিয়ে চলমান সঙ্কট গুরুতর আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে অনেক আগেই সমঝোতায় পৌঁছানো যেত। সৌদি আরব রাষ্ট্র সৃষ্টির অনেক আগেই ইয়েমেন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ছিল একটি ধনী রাষ্ট্র। আর হাউছিরা মূলত ওমানি। তারা ওমান সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় লেবাননের হিজবুল্লাহর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র-গোলাবরুদ ও অর্থ সরবরাহ করে প্রক্সি হিসেবে কাজ করার জন্য হাউছিদের প্রস্তুত করেছে ইরান। তিনি বলেন, সৌদি আবর বরাবরই আঞ্চলিক কোনো জোট বা আলোচনা থেকে ইরানকে দূরে রাখতে চায়। রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনার পর সৌদি আরবের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেয়া সৌদি আরবের জন্য একটি বড় ভুল হবে। ইরাক যুদ্ধের পর সৌদি আরবে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অনেক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা এই ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেছে। এখন হাউছিদের আক্রমণের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশকে আবারো ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ দেয়, তবে তা মুসলিম উম্মাহর জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।
রোকন উদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধবিরতির দরকষাকষিতে লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলের আক্রমণ বন্ধের শর্ত জুড়ে দিয়েছিল ইরান। বর্তমানে হাউছিদের দমনে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলে যদি কোনোভাবে সম্পৃক্ত হয়, তবে ইরান একই ধরনের শর্তারোপ করতে পারে। এখন সৌদি আরবের উচিত হবে হাউছিদের সাথে এবং প্রয়োজন হলে ইরানকে সাথে নিয়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো। তিনি বলেন, সৌদিতে আবারো ঘাঁটি গাড়ার জন্য হাউছিদের সাথে সঙ্ঘাত উসকে দেয়া হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার একটি অংশ। ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য তারা সৌদি আরবের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘাঁটি গাড়ার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে অনুধাবন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইতোপূর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আব্রাহাম অ্যাকর্ড সই করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আমিরাত সফর করে গেছেন। এমনকি আমিরাতে ইসরাইলের ঘাঁটিও রয়েছে। ইসরাইল একইভাবে সৌদি আরবকে রক্ষার এগিয়ে এসে মুসলিম নিধনের খেলায় মেতে উঠতে পারে। ইসরাইলের এ ধরনের একটি প্রস্তাব সৌদি আরব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে শুনা যায়।
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমে একটি অংশ ব্যাপক উৎসাহ দেখিয়ে ছিল উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, এমনকি অনেক সিনিয়র জেনারেলও বলেছিলেন, এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। তবে আমি বরাবরই বলে আসছি, এ ধরনের জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাংলাদেশের সব দিক বিবেচনায় নেয়া উচিত। এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ কি স্বার্থ রক্ষিত হবে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। তুরস্ক যদি ইউরোপের কোনো দেশের সাথে সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়, সেখানে আমাদের কি স্বার্থ থাকতে পারে? এ জন্য মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ প্রথমে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে এই জোটের কর্মকাণ্ড নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলে বাংলাদেশ তাতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








