ইনানীর রিসোর্টে ঘুমের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখায় ১০ পর্যটকের মৃত্যু
উখিয়ায় আগুনে জ্বলছে টুপটুপ রিসোর্ট (ইনসেটে) নিহত স্ত্রী সন্তানের সাথে নুর আলমের ফাইল ছবি :নয়া দিগন্ত।

কক্সবাজার অফিস

Advertisement

রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নিরাপত্তাকর্মী তোফাইল। একপর্যায়ে কেটলির পানি শুকিয়ে আগুন ধরে যায় রান্নাঘরে। এরপর দখিনা বাতাসে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টের বিভিন্ন অংশে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া আগুনে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে প্রাণ হারান ১০ পর্যটক। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের দুই শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে একই পরিবারের ছয়জন। এ ঘটনায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারে শোকের ছায়া নেমে আসে। পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বিষাদে রূপ নেয় নগরটি।  
গতকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী সমুদ্রসৈকতের কাছে পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ‘টুপটুপ’ রিসোর্টে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রিসোর্টের  বেশির ভাগ পর্যটক তখন ঘুমিয়েছিলেন। যে কয়েকজন ভোরে সৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলেন সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে গেছেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয় চায়ের জন্যে পানি বসানো কেটলিতে পানি শুকিয়ে যাওয়ায়। নিরাপত্তাকর্মী তোফাইল চায়ের জন্যে পানি বসিয়েছিলেন। এরপর অগ্নিকাণ্ডে সম্ভবত সিলিন্ডারটি দ্বিতীয় দফায় বিস্ফোরণ ঘটায় মুহূর্তে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। 
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুনে রিসোর্টের ভেতর থেকে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ দিকে, কয়েকজনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যাওয়ায় তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রিসোর্ট সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, শনিবার সকালে চা তৈরির জন্য নিরাপত্তাকর্মী তোফাইল রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় পানি বসান। এরপর তিনি রিসোর্টের সামনের ডিউটি পয়েন্টে এসে চেয়ারে বসেন এবং ঘুমিয়ে পড়েন। সারা রাত ডিউটি শেষে তার চোখে ক্লান্তি ভর করায় এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায় নিমিষে। 
এদিকে, চুলায় জ্বলতে থাকা আগুনে কেটলির পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর রান্নাঘরে আগুন ধরে যায় বলে জানা গেছে। কাঠের তৈরি ভবন হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিনতলা কাঠের রিসোর্টটিতে প্রতি তলায় চারটি করে মোট ১২টি কক্ষ ছিল। ভবনটিতে ওঠানামার জন্য ছিল মাত্র একটি সংকীর্ণ সিঁড়ি। রিসোর্টটিতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ জনের থাকার ব্যবস্থা ছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রিসোর্টটির মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার তানভীর ও লোহাগাড়া উপজেলার নেওয়াজ মোহাম্মদ বলে জানা গেছে। তাদের রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দাবি উঠেছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের কর্মীদের কেউ হতাহত না হলেও পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাকর্মী তোফাইলসহ অন্য কর্মীদের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রিসোর্টে অবস্থানরত একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পাঁচজন প্রাণে বেঁচে গেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন আগুন থেকে বাঁচতে লাফিয়ে বেরিয়ে আসেন। অন্য দুই নারী নিজ নিজ স্বামী ও শিশু সন্তানকে কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে বের হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে তাদের পরিবারের সদস্যদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে নিহত ছয়জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- রাজধানীর বনশ্রী এলাকার ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁও এলাকার লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গা জেলার ফারিহা কবির (৩৩) এবং ফায়িজান আহমেদ (৫)।
নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোর্শেদ হোসেন। বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শাহ উদ্দিন (৩১), তার স্ত্রী ডা. নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। তাদের হাসপাতালে নেয়া হলে দু’জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ঢাকার সাভার থেকে বেড়াতে আসা আইরিন জাহান মিম জানান, পূজার ছুটিতে দুই বান্ধবীকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। শুক্রবার তারা উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। আইরিন বলেন, শনিবার ভোরে তিনি ও তাঁর এক বান্ধবী সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যান। তাদের আরেক বান্ধবী নাসরিন আক্তার তখন রিসোর্টের কক্ষে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সৈকত থেকে তারা রিসোর্টটিতে আগুন জ্বলতে দেখেন। এরপর থেকে নাসরিনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আইরিন জানান, নিখোঁজ নাসরিন আক্তার সাভার এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মনজুর আলম জানান, ভোরে হঠাৎ রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। এ ছাড়া বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেন। ঢাকার সাভার থেকে বেড়াতে আসা আইরিন জাহান মিম জানান, পূজার ছুটিতে তিনি দুই বান্ধবীকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার তারা উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। আইরিন বলেন, শনিবার ভোরে তিনি ও তার এক বান্ধবী সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যান। তাদের আরেক বান্ধবী নাসরিন আক্তার তখন হোটেলকক্ষে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সৈকত থেকে তারা হোটেলটিতে আগুন জ্বলতে দেখেন। বিকট বিস্ফোরণের শব্দের পর আগুন দ্রুত পুরো হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে নাসরিনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজ নাসরিন আক্তার সাভার এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা বলে জানান আইরিন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে ১৮ জন পর্যটক ও তিনজন হোটেলকর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রিসোর্টের ভেতর থেকে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কাকে নিয়ে বাঁচবেন নূর আলম
স্ত্রী ও সন্তানের সাথে নূর আলমের ছবি এখন কেবলই স্মৃতিছবি। তার স্ত্রী বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ। তারপরও পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটাতে কক্সবাজার বেড়াতে যান। নূর আলম নিজেও সাথে গিয়েছিলেন। কক্সবাজার পৌঁছানোর পর অফিসের কাছে গত শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন তিনি। গতকাল শনিবার সকালে গণমাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের খবর জানার পর খোঁজ নিয়ে দেখেন নিহত ছয়জনই তার পরিবারের সদস্য।
চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা নূর আলম তার পরিবারের ছয়জনকে এই অগ্নিকাণ্ডে হারিয়েছেন। তারা হলেন নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা, লায়লা জাহান নাবিলা ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী। নিহত আরেকজন হলেন নাফিসতা মীম। নিহতদের মধ্যে নূর আলমের পরিবার ছাড়া অন্যরা রাজধানীর বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় থাকতেন। নিহত বাকি তিনজনের নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
এ দিকে অগ্নিকাণ্ডে আহত ইসমাইল হোসেন ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা সম্পর্কে ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে। 
উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশ
স্থানীয় বাসিন্দা আলম জানান, ভোরে হঠাৎ রিসোর্টটিতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় বলে তিনি জানান। আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট অংশ নেয়। এ ছাড়া বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করেন। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টটিতে ১৮ জন পর্যটক ও তিনজন হোটেলকর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রিসোর্টের ভেতর থেকে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিহতদের লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। 
ঢাবি শিক্ষার্থী মো: নাফিস তেহামীর মৃত্যুতে ভিসির শোক
ইনানীতে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ‘চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী মো: নাফিস তেহামীসহ তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মৃত্যুতে ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোক বাণীতে তিনি বলেন, এ ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখের ও বেদনার। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শোকাহত। তিনি নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ভিসি অগ্নিকাণ্ডের কারণ চিহত করে অবিলম্বে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিহত পরিবারের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।
উল্লেখ্য, নিহত শিক্ষার্থী মো: নাফিস তেহামীর বাড়ি বরগুনা জেলার আমতলী থানার দক্ষিণ চুনাখালী গ্রামে। তার পিতার নাম মো: জেয়াদুল কবির  এবং মাতার নাম কাজল রেখা।