
নিজস্ব প্রতিবেদক
মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টায় ১৩টি স্পট আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা ছাড়াও তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে হকারমুক্ত ফুটপাথও ঘুরে দেখেন। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে পরিদর্শন শুরু করে বেলা ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। অধিকাংশ স্থানেই সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান প্রধানমন্ত্রী। একইসাথে এসব স্থানে সমস্যা সমাধানে দিন-তারিখও ঠিক করে দিয়ে আসেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, পরিদর্শনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে যান। এরপর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, পাইকপাড়া স্টাফ কোয়ার্টার ও সরকারি বাংলা কলেজ পরিদর্শন করেন।
পরে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ঘুরে দেখেন তিনি। এ ছাড়া নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়, কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার এবং আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার হকারমুক্ত ফুটপাথও ঘুরে দেখেন তিনি।
পরিদর্শনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। নাগরিক সেবা, জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অপরিচ্ছন্নতায় অসন্তোষ
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় দেন তিনি।
অন্য দিকে আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারের সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখে পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ জানান প্রধানমন্ত্রী। পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, আজিমপুর কোয়ার্টার পরিদর্শনের সময় বাসিন্দারা এলাকার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন। তারা আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন। এ সময় কোয়ার্টারে বসবাসরত শিশুদের সাথেও কুশল বিনিময় করেন তিনি। পরিদর্শনকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।
শিশু হাসপাতালে কক্ষে ধূমপান, চিকিৎসক সাময়িক বরখাস্ত
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনকালে নিজ কক্ষে ধূমপান করতে দেখে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতালের ওই চিকিৎসকের কক্ষ অপরিচ্ছন্ন থাকায়ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা: রফিকুল ইসলামের কক্ষে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চিকিৎসককে ধূমপান করতে দেখেন তিনি। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন আচরণ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: এ কে এম আজিজুল হককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ডা: রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ সময় হাসপাতালের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতার আহ্বান
নিজের সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে দেশকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের নিজেদের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করতে হবে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তোমরা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২৪-এর আন্দোলন সফল করেছিলে। এটা কি কোনো একক দল করেছিল? সবাই মিলে করেছিল, তাই না?” প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তবে শুধু আন্দোলন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশ পুনর্গঠন এবং সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার কাজেও তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঢাকার বাতাস ক্রমেই দূষিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে বিশেষ করে শিশুরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। সরকার দেশকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এসব উদ্যোগ পুরোপুরি সফল করা সম্ভব নয়। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তোমরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তোমাদের কাছে আমার দু’টি আবেদন- দেশকে পরিষ্কার রাখবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাবে। এটা তোমাদেরই দেশ, এর দায়িত্বও তোমাদের।” এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
হকারমুক্ত ফুটপাথ ঘুরে দেখলেন
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় হকারমুক্ত ফুটপাথ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় পথচারীদের সাথে কথা বলে তাদের চলাচলের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ নেন তিনি। ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিদর্শনকালে তিনি পথচারীদের কাছে জানতে চান, আগে হকারদের দখলে থাকা ফুটপাথ উচ্ছেদের পর চলাচলে কতটা সুবিধা হয়েছে এবং বর্তমানে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কিনা। নগরীর ফুটপাথ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়েও তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফুটপাথ মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য। তাই তা দখলমুক্ত রেখে সাধারণ মানুষের নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন উপস্থিত ছিলেন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও হাসপাতালের সেবার মান পর্যবেক্ষণ
ডেঙ্গু পরিস্থিতি, রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা দেখতে উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সাথে কথা বলে তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন তিনি। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। এ সময় হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিবন্ধীদের কথা শুনলেন
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সমাজের প্রত্যেকেরই সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিসহ যাদের বিশেষ মনোযোগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন, তাদের পাশে রয়েছে সরকার।
তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সাত্তার দুলালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠনের প্রতিনিধি বক্তব্য দেন। তারা নিজেদের সমস্যা ও বিভিন্ন দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনেন এবং বেশ কয়েকটি দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সম্মতি জানান।
বক্তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান। সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আদালতে ইশারা ভাষার দোভাষী নিয়োগের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী আদালত ও হাসপাতালে ইশারা ভাষার দোভাষী নিয়োগের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, মতবিনিময়ে সবচেয়ে বেশি দাবি এসেছে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী ও কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেবেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মো: মহসিন নামের এক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ক্যাপ নিয়ে এসেছেন জানতে পেরে মঞ্চ থেকে নেমে তা গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিদেশে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মহসিনের দলকে সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন তিনি। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








