রাজনৈতিক শাসনের ফাঁদে দেশের অর্থনীতি
সিরডাপ মিলনায়তনে পিপিআরসি পাবলিকেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত।

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, দেশের অর্থনীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন কর্মসংস্থানের একটি জটিল কাঠামোগত ফাঁদে আটকে পড়েছে। এই সঙ্কট উত্তরণের জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্নীতি বন্ধে একটি রূপান্তর কাঠামোর আওতায় ব্যাপক সংস্কারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সর্বক্ষেত্রে হয়রানি রাষ্ট্রীয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের সব স্তরে হয়রানি দেশের বিনিয়োগসহ সার্বিক অগ্রযাত্রায় বাঁধা সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনীতি এক জটিল কাঠামোগত ফাঁদে আটকা  পড়েছে। এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশকে একটি সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘ট্রানজিশন কমপ্যাক্ট’ বা রূপান্তরমূলক সমঝোতায় গিয়ে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারে যেতে না পারলে পরিস্থিতির কোনো হেরফের হবে না। 
গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে পিপিআরসি প্রকাশিত ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি’ (বাস্তব অর্থনীতির অবস্থা) শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। জিল্লুর রহমান জানান, এই কাঠামোগত ফাঁদ কোনো সাময়িক বা স্বল্পস্থায়ী অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত একটি সমস্যা। তার ভাষায় এই সঙ্কটের তিনটি প্রধান দিক হচ্ছে পারিবারিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক কষ্ট; কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবায় চ্যালেঞ্জ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা। এসব সঙ্কট থেকে উদ্ধার পেতে সংস্কারের পাঁচটি মূল স্তম্ভ হিসেবে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদনশীল রূপান্তর এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উপযোগী সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে তিনি অভিমত দেন। জিল্লুর রহমান বলেন, দেশকে এই কাঠামোগত ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে এবং অর্থনীতিকে একটি টেকসই পথে এগিয়ে নিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবিলম্বে কার্যকর ও সামগ্রিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র ধারাবাহিকভাবে কমছিল কিন্তু এখন এটা বাড়ছে এবং মধ্যবিত্ত নিচে পড়ে যাচ্ছে। একই সাথে সামাজিকভাবে বিপন্নতার আরো নতুন ডাইমেনশন বের হয়ে পড়ছে। অর্ধেক দরিদ্র পরিবারগুলোতে অন্তত একজন ক্রনিক রোগে আক্রান্ত। তাদের ওষুধের বড় বোঝা সইতে হচ্ছে। তবুও মাঠ বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ হাল ছাড়েনি, লেগে আছে; কিন্তু তাদের প্রতি আমাদের কি মানসিকতার জানান দেয়া জরুরি ও রাষ্ট্রের দায় এইসব মানুষের জীবনকে সহজ করা। তিনি বলেন ১০ বছর ধরে সুশাসনের কাঠামোগত যে ফাঁদ তৈরি হয়েছে, এটিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে না পারলে, ভুক্তভোগীদের টার্গেট করতে না পারলে সম্পদের ও দক্ষতার অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না। 
মুষ্টিমেয়দের সুবিধার জন্যে নিয়ম কানুন সাজানো এমন অভিযোগ তুলে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কোলেটারেল ভিত্তিক উচ্চ সুদে কেউ ঋণ নিতে পারছেনা, সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। প্রশিক্ষণের নামে বিপুল সম্পদের অপচয় ঘটছে। এ জন্য শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনীতিকদের সমালোচনার পরিবর্তে সবাইকে সার্বিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণাত্মক ভূমিকা পালন করতে না পারলে হয়রানি যে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাধি’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না। একই সাথে সংস্কার যে কাঠামোগত ফাঁদে পড়েছে কার্যকর বিশ্লেষণের সাথে সেই সংস্কারকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।   
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসম বলেন, উন্নয়নে বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে এবং তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে কি না- তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বাজার ও বিনিয়োগকে জরুরি উল্লেখ করে বলেন রাজনৈতিক রুপান্তর ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পারলে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না। 
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে দারিদ্র্যবিমোচনের স্থিতিস্থাপকতা কমছে তার মানে ডাইভারসিফিকেশন ছাড়া দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসার গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। সরকার যে মেনিফেস্টো নিয়ে এসেছে তাতে খরচ কমানোর সুযোগ নেই; কিন্তু একই সাথে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা কঠিন। জিডিপি বাড়লে যে পরিমাণ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়, বাস্তব চিত্র এমন তথ্য দিচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন গ্লোবাল ইকোনমির অংশ। তিনি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থায় উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করার কথা বলেন। একই সাথে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে গুণগত শিক্ষা ও উৎপাদনক্ষমতার মিশ্রণে আগানোর পরামর্শ দেন তিনি। এ জন্য রাজনৈতিক সুশাসনের দিকে আরো বেশি নজর দিতে আহ্বান জানান সিপিডির এই ডিস্টিংগুইশড ফেলো। 
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো: ফজলুল হক বলেন ২০ বছর ধরে নতুন সম্ভাবনাময় খাতের কথা শুনে আসছি। চামড়া শিল্প, ওষুধ ইত্যাদি কিন্তু কারিগরি শিক্ষার যে গুণগত মান তাতে নতুন প্রজন্মের এ শিক্ষায় আকর্ষণ খুবই কম। কাজের নিরাপত্তা না থাকলে এবং হয়রানিতে নতুন প্রজন্ম রাজি না বলেই তাদের অনেকে দেশে থাকতে রাজি নয়। তিনি বলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এবং জটিলতা ও কষ্টের কঠিন বাস্তবতা বের হয়ে এলে আরো সঙ্কট সৃষ্টি হবে। 
অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নাগরিক বিধায় সরকারি সেবা কিংবা কর দিতে যান সর্বত্রই হয়রানির শিকার হতে হয়। উৎপাদন ব্যবস্থায় এই প্যাটার্নের পরিবর্তন জরুরি। মানুষ এখনো কৃষি কিংবা রেমিটেন্স আয় বলেন, হাল ছাড়েনি। কিন্তু ক্রনিক এলিট ইকোনোমিতে কোনো পরিবর্তন দেখছি না। অথচ খেটে খাওয়া মানুষ কাজের ফাঁকে একটা ডিম ও কলা খাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। প্রচলিত সংস্কার দিয়ে এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। 
কৃষি অর্থনীতিবিদ সাত্তার মণ্ডল বলেন, বৈশ্বিক সঙ্কট দূর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমন উপলব্ধির ফাঁদ থেকে এখন বের হয়ে আসার সময়। কারণ আমাদের এ ধরনের ঘোর কেটে যাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে মূলধনের অনুপ্রবেশের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে নতুন ‘অ্যাক্টর’ আসছে। কৃষির মতো ইতিবাচক খাতে উৎপাদনশীলতায় কার্যকর ভূমিকা না থাকায় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সঠিকভাবে আগাতে পারেনি। 
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, নিজেদের চিন্তার মধ্যে নিজেরাই ফাঁদে আটকা পড়ে আছি। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেলেও অন্তবর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কেউ খুলে দেখছে না। বিশ্বব্যাংকের ৯০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে তা অনুদান হিসেবে ব্যবহারে কি পরিমাণ অনাচার ঘটেছে তা-ও নিরূপণ জরুরি। 
অনুষ্ঠানে আলোচনায় অন্যান্য বক্তা বলেন, সরকারি চাকরিতে পেস্কেলের ঘোষণার চাপ বাজার ও আমাদের শরীরের ওপর এসে পড়েছে। সালাউদ্দিন ইউসুফ বলেন, শিল্প খাতে প্রস্তুতি না থাকায় বিদেশে মেলায় অংশ গ্রহণের পর আইনগত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। কৃষিবিদ আফজাল হোসেন বলেন, সুশাসনে গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে না এবং যেভাবে ব্রেইন ড্রেইন চলছে তাতে নতুন প্রজন্মের টিকে থাকা মুশকিল। কৃষিবিদ তারিক হাসান বলেন, এলাকাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।