ব্রোকার হাউজের অনিয়ম যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি করেছে বিএসইসি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য প্রতিষ্ঠান তাসিয়া সিকিউরিটিজ লিমিটেডের নিট সম্পদে ঘাটতির পেছনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, সম্পদের ঘাটতির সাথে গ্রাহকদের অর্থ বা সম্পদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না এবং এ বিষয়ে অন্য কোনো অনিয়ম বা অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। সম্প্রতি এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ জারি করেছে কমিশন। বিএসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না তা যাচাইয়ে সিকিউরিটিজ হাউজটির  কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি। কমিটিকে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন- বিএসইসির উপপরিচালক মো: এমদাদুল হক, সহকারী পরিচালক মো: মোহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের উপব্যবস্থাপক মো: আল আমিন। এ-সংক্রান্ত আদেশ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় তাসিয়া সিকিউরিটিজের নিট সম্পদের ঘাটতি এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ধারা ২১, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৭ক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট) বিধিমালা, ২০২০-এর বিধি ৭(৪)-এর আওতায় কমিশনের ক্ষমতা প্রয়াগ করে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিধান অনুযায়ী, ব্রোকারেজ হাউজের নিট সম্পদ পরিশোধিত মূলধনের ৭৫ শতাংশের বেশি থাকা আবশ্যক। এই শর্ত পূরণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয়ার সামর্থের সাথে বিষয়টি সম্পর্কিত। কোনো ব্রোকারেজ হাউজ এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট) বিধিমালা, ২০২০-এর বিধি ৭(২) অনুযায়ী তার ট্রেক সার্টিফিকেট বাতিলের বিধান রয়েছে।
তদন্তের প্রয়োজনে তাসিয়া সিকিউরিটিজের কাছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি চেয়েছে বিএসইসি। সম্প্রতি পাঠানো চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স সনদ, ট্রেক, স্টক-ব্রোকার, স্টক-ডিলার ও ডিপিসংক্রান্ত কাগজপত্রের অনুলিপি দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বশেষ তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীও চাওয়া হয়েছে। এসব নথি পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ ও দায়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করবে তদন্ত কমিটি।
এ ছাড়া ডিলার হিসেবে তাসিয়া সিকিউরিটিজের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও চাওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ নভেম্বর ও ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের পোর্টফোলিও বিবরণীর পাশাপাশি গত তিন বছরের তুলনামূলক আর্থিক অবস্থার বিবরণী এবং লাভ-ক্ষতি ও অন্যান্য সামগ্রিক আয়ের হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট পরিচালনা পদ্ধতিও তদন্তের আওতায় থাকছে। এ কারণে মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন এবং পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীর অনুলিপি চেয়েছে কমিশন।
প্রসঙ্গত, গ্রাহকদের অর্থ ও শেয়ার ধারণের তথ্য যাচাইয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। এজন্য ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের কনসোলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টের (সিসিএ) অবস্থা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের ২০ আগস্টের গ্রাহকভিত্তিক শেয়ার ধারণের তথ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার থেকে এক্সেল ও পিডিএফ ফরম্যাটে জমা দিতে বলা হয়েছে।  এ ছাড়া সিসিএসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ ব্রোকারেজ হাউজগুলো গ্রাহকদের অর্থ ও সিকিউরিটিজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থের সাথে গ্রাহকদের অর্থ ও সম্পদের হিসাব পৃথকভাবে  সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে   দেখবে কমিশন। 
এ দিকে সরকারি আদেশে গতকাল শনিবার সপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন কার্যক্রম চলেছে। তবে বিনিয়োগকারিদের অনুপস্থিতি লেনদেনে ঢিলেঢালা অংশগ্রহনের ফলে উভয় পুঁজিবাজারে বিক্রয়চাপ যেমন সক্রিয় ছিল তেমনি  লেনদেনের গতিও ছিল বেশ মন্থর। এর ফলে বাজারগুলোতে সূচকের যেমন অবনতি ঘটেছে তেমনি হ্রাস পেয়েছে লেনদেনও। প্রসঙ্গত, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার ইতোমধ্যে ২০ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। একই সাথে সরকারের এক আদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার সব সরকারি বেসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই অংশ হিসেবে গতকাল ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খোলা ছিল। 
ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৮ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৫ হাজার ৪৫২ দশমিক ০৫ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৩৩ দশমিক ১৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯৯ ও ৫ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩৪ দশমিক ০৩ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৬৩ দশমিক ৪৯ ও ১৫ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট। 
সূচকের অবনতি এবং একই সাথে ধীরগতি গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনে অবনতি ঘটায়। ঢাকা স্টক গতকাল ৩১৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ১৮২ কোটি টাকা কম। গত বৃহষ্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৯৯ কোটি টাকা। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেন নিষ্পত্তি হয় মাত্র সাত কোটি টাকা। বৃহষ্পতিবার এখানে ২০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছিল।

Advertisement