দুর্গাপূজায় নজিরবিহীন নিরাপত্তাবলয়

আমিনুল ইসলাম

Advertisement

কোনো নাশকতার হুমকি না থাকলেও এবারের দুর্গাপূজাকে অগ্নিপরীক্ষা মনে করে সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন, বিশেষ টহল, স্ট্রাইকিং ফোর্স, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। শুধু পুলিশ বা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নয় নিরাপত্তায় বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয়। 
মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তার পাশাপাশি গুজব প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশের সদ্য গঠিত সাইবার ইউনিটের প্রতিটি সদস্য। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব সাইবার ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিঘিœত না হয়, সে লক্ষ্যেই মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো।
এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা পুলিশের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। তিনি বলেছেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে প্রথমবারের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই প্রতিটি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালন করবে ডিএমপি। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসব আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে। উৎসবের শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বাহিনী পৃথক পরিকল্পনার পাশাপাশি সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
দুই লাখের বেশি আনসার সদস্য, প্রস্তুত ১০৪ স্ট্রাইকিং ফোর্স
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় জনবল মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে আনসার-ভিডিপি। বাহিনীটির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে দায়িত্ব পালন করবেন ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন সদস্য। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮৮ জন এবং নারী ৬৬ হাজার ৩৩০ জন।
মণ্ডপের গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় তিন শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বেশি গুরুত্বপূর্ণ ৬ হাজার ৯১৪টি মণ্ডপে প্রতিটিতে আটজন এবং গুরুত্বপূর্ণ ১১ হাজার ৭৮১টি ও সাধারণ ১৪ হাজার ৪৭০টি মণ্ডপে প্রতিটিতে ছয়জন করে আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ জন সদস্য। আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি ও আন্তঃবাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সদস্যদের তথ্য ব্যবস্থাপনা, যাচাই-বাছাই ও মোতায়েন কার্যক্রমে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের পাশাপাশি ভাতা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
সীমান্তের ১,৮০০ মণ্ডপে বিজিবির নজরদারি
সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা প্রায় ১ হাজার ৮০০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) থেকে দূরবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে স্থাপন করা হবে ১৮টি বেইস ক্যাম্প। এর পাশাপাশি পূজা কমিটির সাথে যোগাযোগ, সরেজমিনে পরিদর্শন ও নিয়মিত টহল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সীমান্তের বাইরেও বিজিবির বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, সেক্টর ও রিজিয়ন সদর দফতরের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে। ঢাকার রমনা কালীমন্দির ও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উপকূল ও নদীপথে সাড়ে তিন হাজার কোস্ট গার্ড সদস্য
উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বাহিনীটির আওতাধীন পূর্ব, পশ্চিম, দক্ষিণ ও ঢাকা জোনের মোট ৬১৫টি মন্দির ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পূজার সময় নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত টহল ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রতিমা বিসর্জনকালে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ ডুবুরি দল। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কোস্ট গার্ডের ১৬১১১ নম্বরে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসআরবি সাইবার নজরদারি
দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশব্যাপী বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এসআরবি ফোর্সেস। বাহিনীটির তথ্য অনুযায়ী, ১৫টি ব্যাটালিয়নের ছয় হাজারের বেশি সদস্যকে  নিয়ে ১৩ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়কে প্রতিদিন ৫৪৯টি পিকআপ এবং ৪৪৭টি মোটরসাইকেল টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নাশকতা বা সন্দেহজনক তৎপরতা মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে ডগ স্কোয়াড ও বম্ব ডিসপোজাল টিম। মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসআরবির সাইবার মনিটরিং টিম ২৪ ঘণ্টা গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও সন্দেহজনক প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করছে। পূজামণ্ডপে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নারী দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা পরিবহন ও বিসর্জনের নির্ধারিত রুটেও বিশেষ টহল থাকবে।
২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম, ভরসা ‘শারদীয় সুরক্ষা’ অ্যাপ
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এবারের দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিজিবি সদর দফতরে চালু করা হয়েছে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম, যার মাধ্যমে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তৈরি ‘শারদীয় সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আনসার-ভিডিপির সদস্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে অ্যাপটি ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই একটি অ্যাপের আওতায় থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিটের সদস্যদের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে।  
পুলিশের ৯৯৯ নম্বর, নিরাপত্তায় নাগরিকদেরও দায়িত্ব
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে আর্চওয়ে গেট স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে প্রচার না করা, গুজব থেকে সতর্ক থাকা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। আজান ও নামাজের সময় মসজিদসংলগ্ন মণ্ডপে শব্দযন্ত্রের ব্যবহার সীমিত রাখা, আতশবাজি ও পটকা ফোটানো থেকে বিরত থাকা এবং প্রতিমা বিসর্জনে নির্ধারিত রুট অনুসরণের পরামর্শও দিয়েছে পুলিশ। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা পাওয়া যাবে।সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভির হাসান জোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, পূজা উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড, পুরনো ছবি, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট এবং ধর্মীয় উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সাইবার পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরো বাড়ানো জরুরি।
সাইবার পুলিশের বিভিন্ন প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, দক্ষ জনবল ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা কতটা কার্যকর, সেটি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল মনিটরিং সেল, ফ্যাক্ট ভেরিফিকেশন ভুয়া কনটেন্টের উৎস শনাক্তকরণ, জিডিটাল এভিডেন্ট প্রিজার্ভেশন ও প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। 
শুধু ফটোকার্ড সরিয়ে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারা পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, কিভাবে তা ছড়াচ্ছে এবং এর পেছনে সমন্বিত কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে কিনা, সেটিও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সাইবার পুলিশের ভূমিকা হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত।