প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ
প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশ ও প্রতিবাদকারীদের সংঘর্ষে জ্বলন্ত একটি গাড়ি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এই দেশব্যাপী বিক্ষোভে অংশ নেন : ইন্টারনেট।

ইউরোনিউজ
আমেরিকা ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের জেরে জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। ট্রেড ইউনিয়ন ও নিজেদের পীতবস্ত্র বা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ দাবি করা আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, শ্রেণিকক্ষের উন্নয়ন ও সম্পদ বরাদ্দের দাবিতে দেশজুড়ে চলা এই গণবিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। গতকাল শনিবার দিনভর চলা বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে তীব্র সংঘর্ষের পর সেখান থেকে বহু মানুষকে আটক করেছে পুলিশ।
আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইতেও। সেখানে মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে জোরপূর্বক সিটি হলে ঢুকে পড়েন। পুলিশ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই কয়েকজন ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দেয়ালে নৈরাজ্যবাদের প্রতীক ‘এ’ চিহ্ন এঁকে দেন। এ সময় ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করে এক আন্দোলনকারী ‘বাস্তিল দখলের’ সেøাগান দেন। সম্ভাব্য ভাঙচুর ও লুটপাট এড়াতে দেশজুড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটের সামনের অংশ কাঠের পাত দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। সহিংসতা এড়াতে প্যারিসসহ প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা দমনবাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ অন্তত ৯টি বড় সমাবেশসহ দেশজুড়ে প্রায় ৫০০টি কর্মসূচির সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ঘাটতি ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে গত চার সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা শিক্ষার্থী আন্দোলনের পথ ধরেই এই নতুন বিক্ষোভ জোরালো রূপ নিয়েছে। বেশিরভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু স্থানে দাঙ্গাকারীদের সাথে সংঘর্ষ ও পুলিশি নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো সঙ্ঘাত উসকে দিতে এবং নির্ধারিত পথের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করতে পারে। তবে মহাসড়ক ও জরুরি অবকাঠামো অবরুদ্ধ করা বরদাশত করা হবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গতকাল শুক্রবার জানান, প্রতিবাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকলেও ব্যক্তি ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাইকে শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।
অন্য দিকে সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে পুলিশি সহিংসতার একাধিক ঘটনায় চরম সমালোচনার মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাবার বুলেটে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর চোখ নষ্ট হওয়া এবং কুড়িয়ে নেয়া স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৪ বছরের এক কিশোরের হাত হারানোর ঘটনায় তদন্ত চলছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় নির্দিষ্ট স্টান গ্রেনেড সাময়িক বন্ধ থাকলেও গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ জানান, চরম নগর সহিংসতা দেখা দিলে আজ ১৭ অক্টোবরও তা ব্যবহারের অনুমতি থাকবে। সিনেটে তিনি নিশ্চিত করেন, পুলিশি সহিংসতার অভিযোগে ইতোমধ্যে ৩৬টি আলাদা তদন্ত শুরু হয়েছে, যার মধ্যে অঙ্গহানি ও গুরুতর আঘাতের ঘটনাও রয়েছে। এ দিকে ২০১৮ সালে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পাঁচ বছর পর আজকের এই বিক্ষোভের মাধ্যমে নতুন করে তা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ঝুলন্ত পার্লামেন্টে ব্যয়সংকোচনমূলক বাজেট পাসের চেষ্টা ও তীব্র সরকারি ঋণের মুখে পড়ে এই চরম চাপের মুখে পড়েছে সরকার। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যাকোর্নু পরশু বৃহস্পতিবার জানান, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ৯৩৭ জন পুলিশ, ২৪৮ জন শিক্ষার্থী এবং ১৪৯ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথিতে সর্বোচ্চ।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন চরম সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করলেও দেশের অন্যতম প্রধান পুলিশ ইউনিয়ন অ্যালিয়েন্স পুলিশ ন্যাশনাল মঙ্গলবার সরকারের বিরুদ্ধে ‘অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার’ অভিযোগে মামলা করার কথা ঘোষণা করেছে। ইউনিয়নটির দাবি, মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব ও সাংঘর্ষিক আদেশের কারণে পুলিশ সদস্যদের জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্য দিকে বিরোধী দলীয় বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলাঁশঁ পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানালেও পরবর্তীতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি কেবল শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিকেই সমর্থন করেন।

Advertisement