কর্মসংস্থানের সঙ্কটে পড়বে ৮০ কোটি তরুণ, চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

আশরাফুল ইসলাম, ব্যাংকক থেকে

Advertisement
  •  যুবদের কাজ, দারিদ্র্যবিমোচন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বড় ইস্যু
  •  বিনিয়োগ বাড়ানো, রাজস্ব সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর



বিশ্বজুড়ে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। অথচ এ সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৮০ কোটি। বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিয়ে সৃষ্টি হওয়া এই বৈশ্বিক উদ্বেগ বাংলাদেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ, দেশের অর্থনীতিতে একদিকে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চাকরি তৈরি করা, অন্য দিকে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও বৈশ্বিক সঙ্কটের চাপ সামলানো- সব মিলিয়ে সরকারের সামনে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষাব্যবস্থার সাথে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয়, উৎপাদনশীল খাত সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় নি¤œ আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় আলোচনার মধ্য দিয়ে এসব বিষয় সামনে এসেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান  অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্য দিকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচন, রাজস্ব সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে।
কর্মসংস্থানের বৈশ্বিক সঙ্কট, ঝুঁকিতে বাংলাদেশও : বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বে ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াবে ৮০ কোটি। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টা বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের সবার জন্য যোগ্যতা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। আবার শিল্প ও সেবা খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছে। ফলে এক দিকে শিক্ষিত বেকারত্ব, অন্য দিকে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি- দুই সমস্যাই শ্রমবাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরী পোশাকশিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতে কর্মসংস্থান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা, মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সীমিত। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি করা না গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরো বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের মতে, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। অর্থাৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রবৃদ্ধি কতটা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই : বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু সরকারি চাকরি বা প্রচলিত শিল্পের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদনশীল খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৈরী পোশাকশিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, জনহিতকর উদ্যোগ ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেশি এবং বাজার পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদের উন্নয়ন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে বেসরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে বেসরকারি মূলধন সংগ্রহে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ভূমিকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে। নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট অর্থায়নের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ২৩০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নকে কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার পাশাপাশি কতটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, স্থানীয় শ্রমিকেরা কতটা উপকৃত হচ্ছেন এবং চাকরিগুলো কতটা স্থায়ী ও উৎপাদনশীল- এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সম্প্রসারণও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে হবে : বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো শিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার অসামঞ্জস্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সনদ অর্জন করলেও অনেক তরুণের প্রযুক্তিগত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা, ইংরেজিতে যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতায় ঘাটতি থাকে। অন্য দিকে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মক্ষেত্রে সরাসরি কাজে লাগানো যায়- এমন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খোঁজে। 
এই ব্যবধান কমাতে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কর্মরত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমতে পারে, আবার নতুন ধরনের কাজের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের তরুণদের এসব পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা না গেলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম সাজাতে হবে। একই সাথে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযতেœর সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
দারিদ্র্য কমাতে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগ : কর্মসংস্থান সঙ্কটের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের নি¤œ আয়ের মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষি উপকরণের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটও নতুন করে মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের মূল্যস্ফীতির কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। নতুন করে যাতে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে না নামেন এবং যারা দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন, তাদের সেখান থেকে বের করে আনা যায়- সরকার সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
এ জন্য ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। উপদেষ্টা বলেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে দুর্বলতা ছিল। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকায় স্থান পাননি। অন্য দিকে অযোগ্য ব্যক্তিরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এ সমস্যা দূর করতে ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো ব্যবহার করে উপকারভোগী নির্বাচন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে বলে সরকারের প্রত্যাশা। তবে এ লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে কর্মসূচির আওতা, সহায়তার পরিমাণ, উপকারভোগী নির্বাচনের নির্ভুলতা এবং বাস্তবায়নের কার্যকারিতার ওপর।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সাফল্যের জন্য প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা, নিয়মিত সহায়তা পৌঁছানো এবং অনিয়ম প্রতিরোধ করা জরুরি। একই সাথে এসব কর্মসূচিকে কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা গেলে পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
রাজস্ব সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ : দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর ফাঁকির কারণে রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। আর দায়িত্ব গ্রহণের পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, কর ফাঁকি ও অনিয়ম কমানোর উদ্যোগের ফলে এ অগ্রগতি হয়েছে।
তবে রাজস্ব আয় বাড়াতে শুধু আদায় জোরদার করলেই হবে না। করব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করদাতাদের আস্থা সৃষ্টি করাও জরুরি। রাজস্ব বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অন্য দিকে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটও সরকারের জন্য বড় আর্থিক দায় সৃষ্টি করেছে। উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, পতিত সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির বোঝা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন এবং ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। অন্য দিকে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে রেজল্যুশন আইনের আওতায় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ব্যাংক, অনিয়ম ও আমানতকারীদের আস্থার সঙ্কটের কারণে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে শুধু আর্থিক খাতের সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পাঁচ বছরের অংশীদারত্ব : বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বৈঠকে অংশগ্রহণ শেষে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল বিস্তারিত আলোচনা করবে। এসব আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন ইস্যু চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের গুরুত্ব উন্নয়ন সহযোগীরাও বুঝতে পারছে। ফলে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বব্যাংকের সাথে পাঁচ বছর মেয়াদি অংশীদারত্ব কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তাকে সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে সমন্বয় করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে আলোচনার ভিত্তিতে কী পরিমাণ অর্থায়ন পাওয়া যাবে কিংবা কোন কোন খাতে নতুন সহযোগিতা যুক্ত হবে, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। ফলে এসব আলোচনা থেকে বাস্তবে কী ধরনের আর্থিক ও নীতিগত সুবিধা পাওয়া যাবে, তা পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া। একই সাথে ঋণ ও উন্নয়ন অর্থায়নের ব্যবহার কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার স্বচ্ছ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় এখনই : বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা। এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে আয় বাড়বে, ভোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। বিপরীতে, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে শিক্ষিত বেকারত্ব, অনিশ্চিত আয় ও সামাজিক চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ঘাটতিকে একটি পূর্বাভাস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, অনিবার্য ভবিষ্যৎ হিসেবে নয়। সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য তাই একসাথে কয়েকটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রথমত. কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত. তরুণদের দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। তৃতীয়ত. ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত. করব্যবস্থার সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। পঞ্চমত. উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নকে এমন প্রকল্পে ব্যবহার করতে হবে, যেগুলো দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়ায়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ- এক দিকে বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ সামলে দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্য দিকে ভবিষ্যতের বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ দুই লক্ষ্য অর্জনে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থাপনা। সময়মতো এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।