দিল্লিতে ‘তিরঙ্গা মার্চ’ ঘিরে উত্তেজনা
  •  সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও নেত্রী নেহা বোরা আটক
  •  বিক্ষোভ দমনের কায়দা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

আন্দোলনকারীদের জাতীয় পতাকা ওড়ানো কর্মসূচি ঠেকাতে ভারতের রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুই দিন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ব্যঙ্গাত্মক নামের অরাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) গতকালের জাতীয় পতাকা হাতে পদযাত্রা বা ‘তিরঙ্গা মার্চ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি ও আশপাশের এলাকায় ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সাথে সেন্ট্রাল পার্ক ও রাজীব চক মেট্রো স্টেশনে বাড়তি নজরদারির জন্য নতুন সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানো হয়। এ দিকে গতকাল বিকেলে কর্মসূচি শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে দ্বিতীয়বারের মতো তার নিজ বাসা থেকে আটক করে পুলিশ। এর এক ঘণ্টার মধ্যে যন্তর মন্তর এলাকা থেকে আটক করা হয় দলের আরেক নেত্রী নেহা বোরাকেও।   
সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, নির্বাচনী ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে দলটি। এর আগে বৃহস্পতিবার দলটির শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটকের প্রতিবাদে এই পদযাত্রার ডাক দেয়া হয়। যন্তর মন্তরে জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেন্ট্রাল পার্ককে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় সিজেপি। এ কর্মসূচিতে অভিজিৎ দীপকেসহ অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা এবং আম আদমি পার্টির (আপ) শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (এনডিএমসি) পক্ষ থেকে প্রশাসনিক অজুহাতে দুই দিনের জন্য পার্কটি অবরুদ্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। প্রতিবাদ মিছিল প্রতিরোধে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন আম আদমি পার্টির দিল্লি শাখার প্রধান সৌরভ ভরদ্বাজ। রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, নিজ দেশে তিরঙ্গা ওড়াতে বাধা দেয়া ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের আচরণের নামান্তর। কর্মসূচি সফল এবং পণ্ড করার সরকারি চেষ্টা নিয়ে বর্তমানে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।   এর আগে এই কর্মসূচি পণ্ড করতে সেন্ট্রাল পার্কে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন নগরীর ফুটপাথের এক বিক্রেতা। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নীতিন ওয়াসুদেও সাম্ব্রে ও বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার বেঞ্চ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতের অনুমতি মিললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এর আগে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া শত শত আন্দোলনকারীকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 
এ দিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ এই উত্তাল পরিস্থিতির পেছনে বিদেশী চক্রান্তের গন্ধ পাওয়ার কথা জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। লক্ষেèৗতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশের আদলে’ রাজপথের গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভারতে অরাজকতার মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ষড়যন্ত্র চলছে। তার মতে, তরুণদের উসকে দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অচল করাই বিরোধীদের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে কংগ্রেসের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের স্লোগান সংবিধানের মৌলিক রূপরেখা ধ্বংসের প্রয়াস বলে তিনি দাবি করেন। বিতর্ক আরো বাড়িয়ে তোলে বিজেপিপন্থী সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত আন্দোলনকারী নেহা বোরার একটি ৩৯ সেকেন্ডের সাক্ষাৎকার। ভিডিওতে তাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। তবে ওই প্রচারিত ভিডিওর সময়কাল ও সঠিকতা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। 
বাসা থেকে আটক অভিজিৎ দীপকে : ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ (জাতীয় পতাকা ওড়াও) পদযাত্রা কর্মসূচি শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো হেফাজতে নিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) অনিয়মের প্রতিবাদে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই ১০ অক্টোবর প্রথম দফায় তাকে আটক করা হয়েছিল। কর্মসূচির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার ঠিক আগে দিল্লি পুলিশের একটি বিশেষ দল দীপকের বাসভবনে হাজির হয়ে মিছিল বন্ধের আনুষ্ঠানিক আদেশনামা হস্তান্তর করে এবং তাকে আটক করে।
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএস) ১৬৩ ধারায় জারি করা ওই প্রশাসনিক নোটিশে উল্লেখ করা হয় যে, দিল্লির বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেস ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের গণজমায়েতের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। তা ছাড়া নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) প্রস্তাবিত পতাকাযাত্রার কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করলে তা আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। পুলিশি আদেশে আরও স্পষ্ট করা হয় যে, জাতীয় পতাকা প্রদর্শন বা বহন আইনসিদ্ধ হলেও অনুমতি ব্যতিরেকে জনসমাগম ঘটানো দণ্ডণীয় অপরাধ। ফ্ল্যাগ কোডের বিবিধ ধারা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ৩১ বছর বয়সী এই নেতাকে পতাকাবিধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বার্তা দেয় প্রশাসন। বাসভবনে অবস্থানকালে মোহাৎমা গান্ধীর প্রতিকৃতিসংবলিত টিশার্ট ও কাঁধে তিরঙ্গা ধারণ করা দীপকে নোটিশ পর্যালোচনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাজধানীর বুকে জাতীয় পতাকা হাতে পদযাত্রার ওপর পুলিশের এই কঠোর অবস্থানে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বজনীন মৌলিক অধিকার ও সভা-সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে সুশীলসমাজ ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। 
বিক্ষোভ দমানোর নানা কায়দা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ : বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক এবং চলাচলে বাধা দেয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও। কোথাও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও হয়েছে ধরপাকড়। অক্টোবরের বিক্ষোভে গণগ্রেফতার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ইতোমধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় বলপ্রয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। 
রয়টার্স লিখেছে, ভারতে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের হাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তবে জনশৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে কখন বলপ্রয়োগ করা যাবে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যাবে এবং আটক করার ক্ষেত্রে কী নিয়ম মানতে হবে- সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। 
ভারতের পুলিশি নির্দেশিকা এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর কোথায় ও কিভাবে পুলিশি বাড়াবাড়ি ঘটছে। 
ভারতের আইন ও পুলিশের জন্য প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী, জনশৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে শুধু বিক্ষোভ হচ্ছে- এ কারণে নির্বিচারে বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রথমে ব্যারিকেড দিতে পারে। সতর্কবার্তা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে সরে যেতে অনুরোধ করতে পারে। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। রয়টার্সের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ভারতে বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর নির্ধারিত পোশাক ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল আতঙ্কের মধ্যে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো বিক্ষোভে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে বোঝানো ও সতর্ক করা, এরপর প্রয়োজন হলে ন্যূনতম মাত্রার বলপ্রয়োগ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা বন্ধ করা- এটিই নির্দেশনার মূল কথা। 
দিল্লিতে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে সেখানে কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করা হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও অভিযোগ করা হয়, পুলিশ পেলেট গান, কাঁদুনে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠি ও বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ভারতের নিজস্ব নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দিল্লি পুলিশ অবশ্য বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র বা পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছে, অতীতে অপরাধে জড়িত ছিলেন- এমন কিছু ব্যক্তি বিক্ষোভে সহিংস হয়ে উঠেছিলেন। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জুলাইয়ে একটি কমিটি গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। অক্টোবরের বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ ও আটকের অভিযোগ নিয়েও আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

Advertisement