বাজেট ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে বুয়েন্স আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ

আলজাজিরা 
প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের চরম কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও উচ্চশিক্ষা খাতে তীব্র অর্থসঙ্কটের প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে আর্জেন্টিনার শিক্ষাঙ্গন। দেশটির খ্যাতনামা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুয়েন্স আয়ার্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনে জড়ো হয়ে এক দিনের জন্য তা দখলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিনা খরচে শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং সরকারের ধারাবাহিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানাতেই এই চরম পদক্ষেপ বেছে নিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকদের অভিযোগ, সরকারের কড়া বাজেট সঙ্কোচনের কারণে মানসম্মত শিক্ষকরা হয় দেশ ছাড়ছেন, না হয় বেসরকারি খাতে যোগ দিচ্ছেন। বিদ্যমান আর্থিক সঙ্কটে প্রাপ্ত আয়ে মৌলিক চাহিদাও মেটানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও অধ্যাপনায় যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও দেশের বিনামূল্যে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট মিলেই নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করেন। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সামলাতে তিনি ব্যাপকসংখ্যক সরকারি চাকরি বিলুপ্তকরণ, একাধিক মন্ত্রণালয় অবলুপ্তি, ভর্তুকি ছাঁটাই এবং বিবিধ সরকারি অনুদান বাতিল করেন। সরকারের ভাষ্যমতে, এসব কড়া ব্যবস্থার ফলেই বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার কমে দাঁড়িয়েছে মাসিক প্রায় ২ শতাংশে এবং দেশজুড়ে টানা ২৭ মাস ধরে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরেও নিজের এই অর্থনৈতিক দর্শনের সাফল্য তুলে ধরেন মিলেই।
তবে শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের বড় অংশ সরকারের এই দাবির সাথে তীব্র মতভেদ প্রকাশ করছেন। মিলেই প্রশাসনের নীতিতে এক দিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা মুখথুবড়ে পড়েছে; অন্য দিকে সামাজিক সুরক্ষা তহবিল, পেনশনভোগী ও অসচ্ছল জনগোষ্ঠী চরম দুরবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। গত বছর জাতীয় সংসদে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিশেষ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংক্রান্ত আইন পাস করা হলেও অর্থসঙ্কটের অজুহাতে তা বাস্তবায়ন স্থগিত রাখে প্রশাসন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বরাদ্দ প্রদান ও বেতন সমন্বয়ে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত প্রতিদিন এক লাখ পেসো (প্রায় ৭০ ডলার) হারে জরিমানা ধার্য করেছে সরকারের ওপর। আদালতের নির্দেশনা তামিল না করা এবং অবহেলার প্রতিবাদে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা বুয়েনস আইরেসের রাজপথে নামেন। দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাকে রাজধানীর মধ্যাঞ্চল অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। প্রথমার্ধে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ বাঁধে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের মুখে ক্ষিপ্ত পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কংগ্রেস ভবনের সম্মুখ চত্বর সংঘাতপূর্ণ এলাকায় রূপ নেয়; এ ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীসহ একাধিক ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং অন্তত ২৫ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। আন্দোলনে আসা রসায়ন বিভাগের এক অধ্যাপক আক্ষেপ করে জানান, মাত্র ৭০০ ডলার মাসোহারায় বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠায় তিনি আন্দোলনে বাধ্য হয়েছেন। সার্বজনীন শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় শিক্ষব্যবস্থার সুরক্ষাকে তিনি অপরিহার্য বলে অভিহিত করেন। যদিও মিলেইয়ের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের আশায় একদল নাগরিক এখনো সরকারের সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন, তথাপি চরম বৈষম্যের শিকার সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ এখন আরো জোরদার আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
 

Advertisement