আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সাধারণত কিছু সংরণশীল হয়ে থাকে

 হামিদুল ইসলাম সরকার ব্যাংকক থেকে

Advertisement

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সাধারণত কিছুটা সংরণশীল হয়ে থাকে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও সংস্কার কৌশল অনুযায়ী আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নেয়া হবে। একই সাথে পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির সমতা বাড়িয়ে সরকার প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা অর্জনে আশাবাদী।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
এই সভা ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ সভায় আলোচনা হচ্ছে। 
ড. তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। অতীতের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইএমএফের প্রবৃদ্ধির প্রপেণ সাধারণত কিছুটা সংরণশীল হয়ে থাকে। তবে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নের েেত্র সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, সরকার বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই ল্য অর্জনের ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। তার মতে, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত সংস্কার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনায় নিজস্ব অগ্রাধিকার : আইএমএফের ঋণসহায়তা পেতে বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ড. তিতুমীর বলেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়গুলো এগিয়ে নেয়া হবে। সরকার প্রতিটি পদপে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, শুধু আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেও বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন কৌশল ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরায় জোর : মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবের পাশাপাশি অতীত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, অতীতে সামাজিক সুরা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে নানা সমস্যা ছিল। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকার বাইরে থেকে গেছেন। অন্য দিকে প্রকৃতপে যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা নয়, তাদের অনেকে এসব কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচি পরিচালিত হওয়ায় কাক্সিক্ষত ফলও পাওয়া যায়নি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কার্যকর সামাজিক সুরা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে গত কয়েক বছরে দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে উল্লেখ করে ড. তিতুমীর বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ল্য রয়েছে। সামাজিক সুরা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সামাজিক খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের ল্য এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাকে উন্নয়ন সহযোগীরা ইতিবাচকভাবে দেখছে। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এসব খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
কর আহরণ বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেয়ার ল্য : রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে কর আহরণ ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। একই সাথে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী ও ব্যালান্স শিটের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংক খাতের লুটপাটে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি : ব্যাংক খাতের আর্থিক অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ড. তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ লুটপাটের বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার লুট করা হয়েছে। এই অর্থ জনগণের। তাই আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। তিনি বলেন, যারা অর্থ লুট করেছে এবং যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে, তারা দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুক, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের সমস্যা মোকাবেলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। লুটপাটে সহায়তাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।