
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘আমার স্বামীর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল। মাথায় গুলি লাগায় তার সারা শরীর রক্তাক্ত ছিল। মাথায় ব্যান্ডেজ না করে তার দেহ নড়াচড়া করতে পারছিলাম না।’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় গুলিতে নিহত ইসমাইল হোসেনের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এভাবেই নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তার স্ত্রী লাকি বেগম। স্বামীর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরার পথেও পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের বাধা-হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এক দিকে স্বামীর রক্তাক্ত লাশ, অন্য দিকে ছোটাছুটি করে দাফনের ব্যবস্থাÑ সবমিলিয়ে সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই নারী। ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে স্বামী হত্যার বিচার চান তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল রাষ্ট্রপরে ১৬তম সাী হিসেবে জবানবন্দী দেন লাকি বেগম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার স্যা রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দীতে তিনি স্বামীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া থেকে শুরু করে লাশ উদ্ধার, হাসপাতালে নিয়ে মাথায় ব্যান্ডেজ করানো, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা এবং গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পথে বাধার মুখে পড়ার ঘটনা তুলে ধরেন। একই সাথে স্বামীর মৃত্যুর জন্য মামলার চার আসামিকে দায়ী করে তাদের বিচার দাবি করেন।
এ দিকে এ মামলায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চার আসামির বিরুদ্ধে ১৬ জনের স্যাগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী স্যাগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
জবানবন্দীতে লাকি বেগম জানান, তার বয়স ৩৮ বছর। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। বর্তমানে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাস করেন তিনি। তার স্বামী ইসমাইল হোসেন অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে অটোরিকশা চালানোর জন্য বাসা থেকে বের হন তিনি। প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে বের হলেও সেদিন আর সুস্থ শরীরে ঘরে ফেরা হয়নি তার।
লাকি বলেন, সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু তাদের বাসায় এসে খবর দেন, ডেল্টা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার বাবা মারা গেছেন। আকস্মিক এ খবর শুনে তিনি ও তার ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছুণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে জানতে পারেন, তাদের এক প্রতিবেশী ভ্যানে করে ইসমাইলের লাশ বাসায় নিয়ে এসেছেন।
স্বামীর লাশের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লাকি বলেন, মাথায় গুলি লাগায় তার মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, বেরিয়ে এসেছিল মগজ। মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল, সারা শরীর ছিল রক্তাক্ত। স্বামীর এমন ভয়াবহ পরিণতি দেখে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। লাকি বেগম জানান, পরে লাশের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর জন্য তারা বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। গুলিতে মাথার যে অবস্থা হয়েছিল, তাতে ব্যান্ডেজ না করে লাশ নড়াচড়া করাও সম্ভব হচ্ছিল না। লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে দাফনের ব্যবস্থা করাই তখন পরিবারের প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না তারা। পরে লাকির দেবর বাড়ি থেকে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে বেটার লাইফ হাসপাতালে আসেন। এরপর লাকি, তার ছেলে ও নিকটাত্মীয়রা লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরার পথে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেন লাকি। তার জবানবন্দী অনুযায়ী, পথে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা তাদের নানাভাবে হেনস্তা করেন। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে ইসমাইল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এমন কথা বলার পর তাদের গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় বলে জানান তিনি।
পরদিন ২০ জুলাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে ইসমাইলের লাশ দাফন করা হয়। স্বামীকে হারানোর শোক বয়ে বেড়ানো লাকি বেগমের কাছে সেই দিনের স্মৃতি আজও গভীর বেদনার।
জবানবন্দীতে লাকি বেগম দাবি করেন, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে তার স্বামী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বিজিবির লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো: রাফাত বিন আলম এবং পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা মো: রাশেদুল ইসলাম ও মো: মশিউর রহমানকে দায়ী করেন তিনি। স্যা দেয়ার একপর্যায়ে স্বামীর মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন লাকি। তিনি তার স্বামী হত্যার বিচার চান।
মামলার চার আসামির মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো: রাফাত বিন আলম বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন। তারা ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন। অন্য দুই আসামি ঢাকা মহানগর পুলিশের খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো: রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান পলাতক রয়েছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জন নিহত হন এবং আহত হন আরো অনেকে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চারজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপরে স্যাগ্রহণের ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ১৬তম সাী হিসেবে লাকি বেগমের জবানবন্দী নেয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপরে হয়ে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মামুনুর রশিদ। তাদের সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, মঈনুল করিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা। ১৬ সাীর স্যাগ্রহণ শেষ হওয়ায় এখন পরবর্তী স্যাগ্রহণের জন্য আগামী ২৮ অক্টোবরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে মামলার বিচারিক কার্যক্রম।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








