
চাহিদার ৮৫ শতাংশ গম আমদানিনির্ভর
আটা-ময়দার দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত
লবণাক্ততা, খরা ও আগাম বন্যায় ঝুঁকিতে উৎপাদন
ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও খাদ্যনিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জে পড়েছে বাংলাদেশ। একদিকে চাহিদার তুলনায় চালের উৎপাদন কোটি টনেরও বেশি, অন্যদিকে বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন গমের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন মাত্র ১১ লাখ টনের ঘরে। ফলে গমের চাহিদার বড় অংশ মেটাতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘেœ বাড়ছে আটা-ময়দার দাম, চাপে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলে লবণাক্ততা, বরেন্দ্রে পানিসঙ্কট এবং হাওরে আগাম বন্যা কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানো নয়, কৃষির অভিযোজন সমতা, খাদ্যের বৈচিত্র্য এবং মানুষের ক্রয়মতা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এ প্রেেিত আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘“আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় উদ্ভাবন, ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ব্যবহার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, উৎপাদনের সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের সরবরাহ, বাজারমূল্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গমের চাহিদা বাড়ছে, উৎপাদন বাড়ছে না
দেশে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় চার কোটি ২৪ লাখ টন। বার্ষিক চাহিদা তিন কোটি সাত লাখ থেকে তিন কোটি ৯ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি। বিপরীতে, বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন গমের চাহিদার বিপরীতে গত অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার টন। গত প্রায় ১৭ বছর ধরে গমের বার্ষিক উৎপাদন এই সীমার আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
কৃষি উৎপাদনের এ বৈপরীত্যের সাথে যুক্ত হয়েছে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুযায়ী, ছয় বছরের ব্যবধানে গমজাত খাবারের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। শহরাঞ্চলে বৃদ্ধির হার প্রায় ২৬ শতাংশ। একই সময়ে চালের ভোগ কমেছে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসচেতনতা, নগরজীবনের পরিবর্তন এবং খাবারে বৈচিত্র্য আনার প্রবণতায় রুটি, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, নুডলস ও পাস্তা এখন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ। অনেক পরিবারে এক বেলা ভাতের পাশাপাশি দুই বেলা রুটি খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কয়েক বছর আগে চালের তুলনায় আটার দাম কম থাকায় নি¤œ আয়ের মানুষও ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য রুটির দিকে ঝুঁকেছিলেন। গত বছর মোটা চালের কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা থাকলেও খোলা আটার দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।
কিন্তু গমের উৎপাদন না বাড়ায় খাদ্যাভ্যাসের এ পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারছে না দেশীয় কৃষি। গত অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টন গম আমদানি করতে হয়েছে। অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ স্থানীয় উৎপাদনে মিটলেও বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আটা-ময়দার দাম বাড়ায় ভোক্তার চাপ :
আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বিঘœ, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের গমের বাজারে দ্রুত পড়ে। এতে কয়েক বছর আগে তুলনামূলক সস্তা খাবার হিসেবে গমজাত পণ্য বেছে নেয়া পরিবারগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দাম সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গত বছর প্যাকেটজাত ময়দার কেজি ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা আটা-ময়দার দামও ধরনভেদে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে, টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় মোটা চালসহ কয়েক ধরনের চালের দাম সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এতে খাদ্যবাজারে পণ্যের মূল্যচাপের অসম চিত্র ফুটে উঠেছে। চালের বাজারে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও আটা-ময়দার বাড়তি দাম খাদ্যব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করছে।
খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে এ পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে খাদ্যপণ্য থাকলেই মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; তা কেনার সামর্থ্যও থাকতে হয়। বিশেষ করে নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর আয় সীমিত হলে খাদ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে খাবারের পরিমাণ কিংবা পুষ্টির বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে এফএওর সতর্কতা: জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত মূল্যায়নে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ধান উৎপাদনে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও গমের আমদানিনির্ভরতা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়মতার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
এফএওর উল্লেখ করা সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণীবিন্যাসের (আইপিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত খাবার কেনার আর্থিক সামর্থ্যের অভাব। অর্থাৎ দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সরকারি মজুদ ভালো থাকলেও মানুষের আয় ও খাদ্যের দামের মধ্যে অসামঞ্জস্য খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি তাই কেবল উৎপাদন বা মজুদের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। খাদ্যের প্রাপ্যতা, বাজারে সহজলভ্যতা, ক্রয়মতা এবং পুষ্টিমানÑ সবগুলো বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে চালের সাফল্যের পাশাপাশি গমের উৎপাদন ঘাটতি কমানো এবং পুষ্টিকর খাবার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
গম চাষে কৃষকের আগ্রহ কমছে :
দেশে গম উৎপাদন বাড়ানোর পথে বড় বাধা আবাদি জমি কমে যাওয়া। গত শীত মৌসুমে মাত্র দুই লাখ ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। অথচ ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে গমের আবাদ হয়েছিল আট লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শীতকালে গমের পরিবর্তে বেশি লাভজনক ফসল চাষের প্রবণতা বেড়েছে। ভুট্টা ও আলু গমের আবাদি জমির একটি বড় অংশ দখল করেছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, বিক্রির নিশ্চয়তা এবং বিকল্প ফসলের তুলনায় লাভের হিসাবই এ সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, গমের ব্লাস্ট রোগ, শীত মৌসুম ছোট হয়ে আসা এবং উঁচু ও শুকনো জমিতে ইঁদুরের উপদ্রব। এসব কারণে গম চাষের ঝুঁকি বাড়ছে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ রেজাউল কবীর বলেন, গত ১০ বছর ধরে প্রতি বছর গমের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং নতুন নতুন জাত উদ্ভাবিত হচ্ছে। তারপরও কৃষকরা গম বাদ দিয়ে লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
গবেষকদের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা না গেলে গমের আবাদ বাড়ানো কঠিন হবে। তাই নতুন জাত সম্প্রসারণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত বীজের সরবরাহ এবং বাজারের নিশ্চয়তাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
ধান উৎপাদনে বড় অগ্রগতি :
গমের বিপরীতে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন ছিল প্রায় তিন কোটি ৬৬ লাখ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে চার কোটি ২৪ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ছয় বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫৮ লাখ টন।
স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতি মোকাবেলা করে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। উন্নত জাত, সেচব্যবস্থা, কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার এবং কৃষকের শ্রম এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চালের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সরকারি গুদামেও উল্লেখযোগ্য মজুদ রয়েছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে চালের মজুদ ১৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ টন। তবে অতীতে উৎপাদনে স্বস্তি থাকলেও কোনো কোনো সময়ে চাল আমদানি করতে হয়েছে। ফলে বর্তমান উৎপাদন ও মজুদের পরিস্থিতি ধরে রাখতে উৎপাদনব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবেলা এবং বাজারের ওপর নজর রাখা জরুরি।
জলবায়ুর চাপে কৃষির তিন বাস্তবতা:
খাদ্যনিরাপত্তার আরেক বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। উপকূল, বরেন্দ্র ও হাওরে এর প্রভাব ভিন্ন হলেও তিন েেত্রই কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা ও আয় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যভিত্তিক ২০২৩ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, উপকূলের প্রায় ১৬ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততায় আক্রান্ত। ১৯৭৩ সালে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল প্রায় আট লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর। মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেলে ধানের বৃদ্ধি ও ফলন ব্যাহত হতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








