সড়ক, রেল ও আকাশ পথে কোথাও মিলছে না স্বস্তি
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুরে চলছে ছয় লেনের নির্মাণকাজ : নয়া দিগন্ত।

 

Advertisement

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ধীরগতির উন্নয়নকাজে দীর্ঘ যানজট, রেলে টিকিটের মারাত্মক সঙ্কট ও কালোবাজারির অভিযোগ এবং আকাশপথে চড়া ভাড়াÑ সব মিলিয়ে সিলেটবাসীর যাতায়াতে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এক পথের ভোগান্তি এড়াতে অন্য পথ বেছে নিলেও যাত্রীদের কপালে মিলছে না স্বস্তি। সড়ক, রেল ও আকাশপথের এই ত্রিমুখী সঙ্কটে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা যেন পড়েছেন ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’ দশাগ্রস্ত অবস্থায়।
জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট ছয় লেনের মহাসড়কের নির্মাণকাজের ধীরগতি ও তীব্র যানজটে সড়কযাত্রা এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত। এই পথে ঢাকা পৌঁছাতে বর্তমানে লাগছে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। বিকল্প হিসেবে রেলপথের ওপর মানুষের চাপ বাড়লেও অনলাইনে টিকিট বিক্রির শুরুতেই নিমিষেই আসন শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। এর মধ্যে আগাম টিকিট আটকে রাখা ও চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অন্য দিকে, সড়ক ও রেলের এই ভয়াবহ দুর্ভোগ এড়িয়ে বিমানে যাতায়াত করতে গেলেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ও চড়া ভাড়া।
সড়কপথের বিকল্প হিসেবে সিলেট-ঢাকা রেলপথে নতুন ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি ডাবল লাইন নির্মাণকাজেও নেই কোনো কাক্সিক্ষত অগ্রগতি। ফলে তিন পথেই বেহাল দশায় পড়েছেন যাত্রীরা। সময়, অর্থ ও স্বাচ্ছন্দ্যÑ কোনো দিক থেকেই মিলছে না কাক্সিক্ষত স্বস্তি। গত ১২ অক্টোবর থেকে অন্যের নামে কাটা টিকিটে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হলেও টিকিটসঙ্কট একটুও কাটেনি। বাধ্য হয়ে চরম কষ্ট সত্ত্বেও অনেককে সড়কপথ বেছে নিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন অসুস্থ রোগী, জরুরি কাজে রাজধানীগামী মানুষ এবং বিদেশযাত্রীরা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকলেও কাজের কচ্ছপ গতি, ভাঙাচোরা সড়ক, ছোট-বড় গর্ত এবং দীর্ঘ যানজটে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সিলেট থেকে ঢাকা কিংবা ঢাকা থেকে সিলেটে যাতায়াতে কখনো কখনো ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় অপচয় হচ্ছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নির্মাণকাজের সুফল কবে নাগাদ মিলবে, তা নিয়েও রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
এ দিকে মহাসড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। সিলেট অংশের কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হলেও পুরো প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি। এ নিয়ে মন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে সময়সীমা নিয়ে বিতর্কের বাইরে সাধারণ যাত্রীদের মূল প্রত্যাশাÑদ্রুত কাজ শেষ করে এই জনদুর্ভোগের অবসান ঘটানো।
রেলপথের চিত্রও বেশ নাজুক। সিলেট থেকে ঢাকা রুটের উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রাম রুটের পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের টিকিট পাওয়া সোনার পাথর বাটিতে পরিণত হয়েছে। অনলাইনে টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব আসন শেষ হয়ে যায়। অথচ পরবর্তীতে বিভিন্ন অবৈধ মাধ্যমে চড়া দামে সেই টিকিট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও সেগুলো কীভাবে কালোবাজারিদের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
বিষয়টি নজরে আসার পর সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা দায়ের করেন। টিকিট কালোবাজারি ও মজুদদারির সন্দেহে করা মামলাটি বর্তমানে পিবিআই, সিলেট তদন্ত করছে। গত ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের হাতে পৌঁছায়। এ দিকে পরিবহন অডিট অধিদফতরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার আগেই টিকিট অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। সহজ ডটকমের কর্মীদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক ও আসন সংরক্ষণের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম ঠেকাতে গত ১২ অক্টোবর থেকে অন্যের নামে কাটা টিকিটে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। টিকিটের নামের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) মিল না থাকলে ভ্রমণ করতে দেয়া হবে না বলা হলেও টিকিটসঙ্কটের দৃশ্যমান কোনো সমাধান মেলেনি। সিলেটে বড় ধরনের অভিযান বা কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে টিকিট কালোবাজারির দায়ে সম্প্রতি একজনকে দণ্ড দেয়া হলেও বিচ্ছিন্ন অভিযানে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। 
সিলেট-ঢাকা রেলপথে যাত্রীদের চাপ কমাতে ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে তা শুরু হয়নি। গত ৩ সেপ্টেম্বর ট্রেনটি চালুর কথা সংসদে জানানো হলেও ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় তা পিছিয়ে যায়। অন্য দিকে ডাবল লাইন নির্মাণে গতি না থাকায় বিদ্যমান ট্রেনের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। দ্রুত যাতায়াতের আশায় অনেকে আকাশপথ বেছে নিতে চাইলেও সিলেট-ঢাকা রুটে বিমানভাড়া সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। জরুরি প্রয়োজন বা চিকিৎসায় বাধ্য হয়ে অনেকে আকাশপথ বেছে নিলেও উচ্চ ভাড়ার কারণে তা সবার জন্য সাশ্রয়ী নয়।
প্রবাসী আয়, চা শিল্প, গ্যাস ও পর্যটনসমৃদ্ধ সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতিতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। জাফলং, রাতারগুল বা শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্রগুলো যোগাযোগের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির মহাসড়কের কাজ পরিদর্শন করে জানান, ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পুরো কাজ শেষ হবে এবং সিলেট অংশের কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। মহাসড়কের কাজ শেষ হওয়ার সময় নিয়ে সরকারের একেক মন্ত্রী একেক ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করে মহাসড়কটির দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রীদের আরো দায়িত্বশীল ও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।