সৌদি আরব, বিমানবন্দরে হামলা
সৌদি আরব যাওয়ার বিমানের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা : নয়া দিগন্ত। নয়া দিগন্ত

 

Advertisement

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাংলাদেশী যাত্রীরা। নতুন ও পুরনো কর্মী, ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসী এবং বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট ফ্লাইটের টিকিট কাটা যাত্রীদের একটি বড় অংশ ঢাকায় আটকে পড়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সৌদিগামী ও সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ৮২টি ফ্লাইট নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যেতে পারেনি। এতে ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী আটকে পড়েছেন। অন্য দিকে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশী নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ সরকার। 
এ দিকে যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও রিয়াদ রুটের ফ্লাইট ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো। জরুরি প্রয়োজনে সৌদি আরবে যাতায়াত কিংবা বাংলাদেশে ফেরার জন্য জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 
একের পর এক ফ্লাইট বাতিল 
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্যানুযায়ী রিয়াদ ও দাম্মামসহ সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত বিঘেœর প্রভাব পড়েছে সরাসরি সৌদিগামী এবং বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর হয়ে যাতায়াতকারী ট্রানজিট ফ্লাইটেও। মঙ্গলবার বেলা ১টা ১৫ মিনিটে প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ৬২টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৭৪। সন্ধ্যায় পাওয়া পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী, ফ্লাইটের সংখ্যা বেড়ে ৮২ এবং যাত্রীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৭১ হয়েছে। 
বেবিচকের তথ্যানুযায়ী, সরাসরি সৌদিগামী ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে চলাচল করতে পারেনি বলে প্রাথমিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, সালাম এয়ারের চারটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি  ফ্লাইটের কথা বলা হয়েছে। 
তবে বেবিচকের বিভিন্ন সময়ের হিসাবের মধ্যে ফ্লাইট ও যাত্রীর সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ সমন্বিত হিসাব প্রকাশের পর চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যাবে। 
বিমানবন্দরে গিয়েও ফিরতে হচ্ছে 
হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ের আগেই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে বিপাকে পড়েন। লাগেজসহ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের নির্দেশনা পেয়ে তাদের অনেকে বাসায় ফিরে যান। নতুন করে যাত্রার তারিখ নির্ধারণ, টিকিট পরিবর্তন এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। 
বিশেষ করে যেসব কর্মী নতুন চাকরিতে যোগ দিতে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাদের দুর্ভোগ বেশি। অনেকেই বিদেশযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত, মেডিক্যাল পরীক্ষা, ভিসা ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছেন। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরির সুযোগ হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। কারো কারো ভিসা ও টিকিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। 
অন্য দিকে সৌদি আরবে ছুটি কাটিয়ে দেশে ফেরার জন্য টিকিট কাটা প্রবাসীরাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় তাদের কেউ কেউ বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করে যাতায়াতের চেষ্টা করছেন। তবে বিকল্প পথে যাত্রার সুযোগ সীমিত এবং ভাড়া, টিকিটের প্রাপ্যতা ও সংযোগ ফ্লাইটের সময়সূচি নিয়ে জটিলতা রয়েছে। 
১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত বিমানের ফ্লাইট 
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা-রিয়াদ ও ঢাকা-দাম্মাম রুটের ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিতের সিদ্ধান্তের পরবর্তী পরিবর্তন, নতুন সময়সূচি ও যাত্রীদের করণীয় সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য বিমান কর্তৃপক্ষ জানাবে। 
জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত কিংবা বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা বিবেচনা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে টিকিট, ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং বিকল্প রুটের অনুমোদন সম্পর্কে নিকটস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। 
বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) মো: কামরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা এবং ঢাকা-দাম্মাম-ঢাকা রুটে তাদের ফ্লাইট চলাচল ২১ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে দ্রুত ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতিও রয়েছে বলে তিনি জানান। 
তিনি বলেন, হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় যাত্রীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিমান পরিবহন খাতও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ মুহূর্তে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা কঠিন। যেসব যাত্রী ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় রয়েছেন, তাদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিকল্প পথে সৌদি আরবে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরির বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এ ধরনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সব যাত্রীকে একইভাবে সহায়তা করা সম্ভব হচ্ছে না। 
হামলায় দুই বাংলাদেশী নিহত, আহত ২৭ 
সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আহত হয়েছেন আরো ২৭ বাংলাদেশী। তাদের চিকিৎসা এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছে। নিহতদের লাশ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর কাজ করছে। তবে হামলার পর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। 
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের হাউছি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমানবন্দরটি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দরেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘœ ঘটেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। 
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের খোঁজ নিচ্ছে সরকার 
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশী প্রবাসীদের বিষয়ে সরকার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শ্রম উইংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। 
মন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশী প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এ কঠিন সময়ে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসীদের সতর্ক ও নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো সমস্যার সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। 
এ দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সাথে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যাত্রীদের টিকিট পরিবর্তন, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প রুটে যাত্রার বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা সংগ্রহেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেীশর জীবিকা, পরিবারের আয় এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর সাথে এই শ্রমবাজার সরাসরি যুক্ত। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিমান চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘœ ঘটলে তা শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিদেশে কর্মসংস্থান, নিয়োগপ্রক্রিয়া, শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। 
আবারো হামলা আতঙ্কে হাজার হাজার প্রবাসী 
আবারো যেকোনো সময় বড় ধরনের হামলা হতে পারে- এমন আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটছে হাজার হাজার সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীদের। অনেকে ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। 
গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে সৌদি আরবের দাম্মামে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, গত দুই দিন ধরে এখানে আর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে যদি হামলা হয়ই, তাহলে রাতের যেকোনো সময় হতে পারে। এমন আশঙ্কার মধ্যে আছি। ভয়ে এখন অনেকেই ঘর থেকে বের হচ্ছি না। এভাবে চললে পরিস্থিতি শেষমেষ কি যে হয় তা বুঝতে পারছি না।