
নিজস্ব প্রতিবেদক
আইন পেশার মর্যাদা পুনরুদ্ধার, বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ আইনজীবীদের নৈতিক ও দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স এবং অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাদের মতে শুধু আইনের জ্ঞান নয়- সততা, মানবিকতা, পেশাগত শৃঙ্খলা ও জনসেবার মানসিকতাই একজন আইনজীবীর প্রকৃত পরিচয়। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, আইনের শাসন সুদৃঢ় করা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তরুণ আইন পেশাজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির সমাবর্তন ও ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে আইন পেশায় মেধার মূল্যায়ন, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, নৈতিকতার চর্চা এবং বিচারব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো।
এ ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস, জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার, জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী (এমপি) অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেছেন, আইন পেশাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে একজন আইনজীবীর পরিচয় শুনলেই মানুষ তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। এ জন্য শুধু আইনের বই পড়লে চলবে না; অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, রসায়ন ও অ্যানাটমিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হবে। কারণ, আইনজীবীরা কেবল আইন প্রয়োগ করেন না, সমাজের অসঙ্গতি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের পথও দেখান।
অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে তরুণ আইন স্নাতকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরির চিন্তা থেকে ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তার লক্ষ্য ছিল, প্রতি বছর অন্তত ১০০ জন ইন্টার্ন তৈরি করে পাঁচ বছরে ৫০০ জনকে এই অভিজ্ঞতার আওতায় আনা। নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি বা পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে মেধাকে প্রাধান্য দেয়া এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়। শুরুর দিকে কাজ করেও অনেক সময় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তবে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়েই একজন আইনজীবী প্রতিষ্ঠা পান। এই বাস্তবতার সাথে আগামী দিনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তার মতে এআই আইন পেশার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। তাই তরুণদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়ানোর পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
মানবাধিকার কমিশন আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও সাইবার আইন সংশোধনের মতো উদ্যোগে তরুণ আইনজীবীদের অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, মক্কেলের সাথে প্রতারণা, বিচারককে প্রভাবিত করার মিথ্যা দাবি কিংবা মামলার ফল নিয়ে অসৎ প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায়ের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বিচারকদের মতো আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তার মতে দরিদ্র মানুষের পক্ষে মামলা পরিচালনা এবং আর্থিক সামর্থ্যহীন মানুষের অধিকার রক্ষায় আইনজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে একজন আইনজীবীকে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষও হতে হবে।
আইন পেশার মর্যাদা বাড়াতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের কথাও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রশাসন বা অন্যান্য পেশায় চাকরি করে অবসরে যাওয়ার পর আইনজীবী হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তার মতে আইনপেশাকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে পেশাটির কাঠামো ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিক্স বলেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কেমন রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে গড়ে উঠবে, তা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনে তরুণ আইন পেশাজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমান সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকেরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রেখেছিলেন, তা মূল্যায়ন করবে।
তিনি বলেন, কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা। ভবিষ্যতের আইনজীবীদের কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি সততা, স্বাধীন বিচারবোধ ও জনসেবার মানসিকতা থাকতে হবে। আইন কেবল জানা নয়, সেই আইন কাদের সুরক্ষা দেয় এবং মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলে, তা বোঝাও জরুরি।
স্টিফেন রড্রিক্সের মতে, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দিচ্ছে। অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সাথে কাজ, আইনি গবেষণা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের মতো কার্যক্রম তাদের মানবাধিকার, বাস্তুচ্যুতি ও অসহায় মানুষের বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করে। প্রতিটি আইনি মতামত ও আদালতের রায়ের পেছনে একজন মানুষ এবং তার অধিকার জড়িয়ে থাকে এই উপলব্ধি আইনজীবীদের দায়িত্ব পালনের কেন্দ্রে থাকা উচিত।
তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য শুধু নিয়ম প্রয়োগ নয়; মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং নাগরিকের সাথে প্রতিষ্ঠানের আস্থা দৃঢ় করা। চতুর্থ ব্যাচ থেকে কর্মসূচিটির সম্পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের গ্রহণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি একে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, কিছু আইনজীবীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো আইন পেশার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে। আদালতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন, বিচারককে বিভ্রান্ত করা কিংবা ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। পেশাগত সাফল্যের জন্য অনৈতিক পন্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইন পেশাকে শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করে অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের ১৬০ জন আইন কর্মকর্তাকে ইউএনডিপি ও সংশ্লিষ্ট সহযোগীদের উদ্যোগে পেশাগত নৈতিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার কথাও জানান তিনি।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচারক, প্রতিপক্ষের আইনজীবী ও মক্কেলের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আইনি বিতর্কে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসৌজন্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো স্থান আইন পেশায় থাকা উচিত নয়। গোপনীয়তা রক্ষা এবং পেশাগত আচরণবিধি মেনে চলাও অপরিহার্য।
তরুণ আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু আইনের জ্ঞান নয়, সততা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও মানবিক মূল্যবোধকে পেশাগত জীবনের ভিত্তি করতে হবে। বিচারব্যবস্থার শক্তি শুধু আইন প্রণয়ন বা মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না; জনআস্থা, ন্যায়বিচারে সমান সুযোগ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাই এর প্রকৃত ভিত্তি।
তিন বক্তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে মেধাবী আইনজীবী তৈরির পাশাপাশি পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দক্ষতা, সততা ও মানবিকতার সমন্বয়েই আইন পেশার মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








