
বিডি জবস ডটকমের সিইও ফাহিম মাশরুর বলেছেন, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বাজারের সঙ্কট গত ৪/৫ বছরে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিক্ষিতদের মধ্যে এ সমস্যা আরো বেশি প্রকট। জাতীয়ভাবে বা অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিতদের মধ্যে কর্মসংস্থানের অভাব অতটা প্রকট নয় কারণ তারা যে কোনো ধরনের কাজ পেলে তা করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বাধ্য হয়ে হলেও। কিন্তু শিক্ষিত তরুণরা তা করতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে এ খাতের অভিজ্ঞতা থেকে ফাহিম মাশরুর নয়া দিগন্তকে বলেন, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হবার পর তাদের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ লোক কোনো কাজ পাচ্ছে না বা জব মার্কেটে ঢুকতে পারছে না। গত কয়েকবছর ধরে কোনো চাকরি নেই। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন বেকার তৈরির কারখানা বলতে শুরু করেছেন অনেকে।
অন্তবর্তী সরকারের সময় এ সঙ্কট নিরসনে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয় এবং সেই টাস্কফোর্সে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে ফাহিম মাশরুর বলেন সরকারের পলিসি লেভেলে কর্মসংস্থান বাজারের এ সঙ্কট নিয়ে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। গত মাসে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ৩৬ শতাংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। এই একই ধরনের শঙ্কা গত কয়েক বছর ধরে আমরা করছি কিন্তু আমাদের কথায় কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। গত ১৫/২০ বছর আগে যতটা শিক্ষিত বেকার ছিল তার চেয়ে এখন অনেক বেশি এর মূল কারণ দুইটি, একটি হচ্ছে চাকরির বাজারে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর চাহিদা বাড়েনি কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান বাজারে প্রবেশের হার অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিবছর প্রায় সাড়ে সাত লাখ গ্রাজুয়েট তৈরি হচ্ছে। এদের চার থেকে সাড়ে চার লাখ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে ২২’শ কলেজ আছে সেই কলেজগুলো থেকে এরা পাশ করে বেরিয়ে আসছে। যত লোক গ্রাজুয়েট হচ্ছে তার ৭০ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে।
তিনি বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি শূন্যপদে যে প্রায় তিন লাখ পরীক্ষার্থীর অধিকাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণ। জাতীয়ভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৩৬ শতাংশ বলা হলেও আমাদের হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ৫০ শতাংশ তরুণ বেকার থেকে যাচ্ছে। সঠিক সময়ে একজন তরুণ ২২/২৩ বছরে পাশ করছে কিন্তু ৩০ বছর বয়স হয়ে গেলেও চাকরি পাচ্ছে না। সরকারি চাকরি ওদের জন্যে সোনার হরিণ।
প্রশ্ন : কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণরা তো একবুক আশা নিয়েই যায় পড়তে, বেকার হতে নয়
ফাহিম মাশরুর : গ্রাজুয়েট হলেই চাকরি পাবে এমন কেউ ভাবলে তা সবচেয়ে ভুল ধারণা। গ্রাজুয়েট না হলেও কাজের একটা সুযোগ থাকে যেমন এখন সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে প্রচুর কাজ হচ্ছে। সরকারও সৌর বিদ্যুতের ওপর বেশ কিছু বেনিফিট দিয়েছে। এখন এ খাতে গ্রাজুয়েটের চেয়ে বরং টেকনিশিয়ান দরকার। যারা সোলার ইনস্টল করতে পারবে। আমাদের আসলে টেকনিক্যাল ক্যাপাবিলিটির লোক দরকার। ডিগ্রিধারী সার্টিফিকেট হোল্ডার দরকার নেই।
প্রশ্ন : অনেক তরুণ দেশের বাইরেও যাচ্ছে
ফাহিম মাশরুর : দেশের বাইরে যাতে আরো দক্ষ লোক পাঠানো যায় সে চেষ্টা বাড়াতে হবে। প্রতি বছর দশ লাখ তরুণ বিদেশে যাচ্ছে। অধিকাংশই অশিক্ষিত ও অদক্ষ। সৌদি আরব কিংবা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে আট থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করে। কিন্তু গ্রাজুয়েটদের পাঠাতে পারলে ভাল হতো। যাদের একেবারে পড়াশুনা নেই তারা কিছু না কিছু করে খাচ্ছে। ইলেক্ট্রিক রিকশা চালাচ্ছে বা কৃষি কাজ করতে পারছে, যে লোকটা গ্রাজুয়েট সে আবার এসব কাজ করতে পারে না। সামাজিক বা অন্য কারণে হোক এসব কাজে সে ঢুকতেও পারছে না। ভাষা শিখিয়ে এদের বিদেশে পাঠানো জরুরি। জাপানসহ বিভিন্ন দেশে গ্রাজুয়েট এবং কিছুটা দক্ষ এ ধরনের জনশক্তির প্রচুর চাহিদা তৈরি হচ্ছে। যেখানে আবার অশিক্ষিত লোক যেতে পারে না।
প্রশ্ন : ওসব দেশে কি ধরনের কাজের ডিমান্ড বাড়ছে তা লক্ষ্য করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়ার আগাম ব্যবস্থা কি নেয়া যায় না?
ফাহিম মাশরুর : এটা সমস্যা। প্রশিক্ষণের যে সরকারি অবকাঠামো তাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে ওসব দেশে পাঠানো যাচ্ছে না। অলরেডি জাপানে যেটা হচ্ছে যে সেদেশেই কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ২০/২১ বছর বয়সে যদি জাপানি ভাষা শিখিয়ে ওদেশে পাঠাতে পারি তরুণদের তাহলে সে ওদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিতে পারবে এবং দক্ষ জনশক্তি হয়ে গড়ে উঠতে পারবে। সে যখন দেশে ফিরবে অন্তত দক্ষ জনশক্তি হিসেবে ফিরবে, এখানেও তাদের নিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠাতে পারি তরুণদের যারা ওদেশে যেয়ে কারিগরি শিক্ষা নিতে পারে। সেখানে ভাষাও শিখতে পারে। ওখানে প্রশিক্ষণ পেলে তা তার জন্যে ‘মাচ মোর রিলেভেন্ট’ হবে। কাজের সাথে ফ্যামিলিয়ার হয়ে যাবে সহজেই।
প্রশ্ন : কিন্তু বিদেশে যাওয়ার টাকা সে পাবে কোথায়?
ফাহিম মাশরুর : অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেয়া টাস্কফোর্সে আমরা প্রস্তাব করেছিলাম সরকার এই টাকাটা ঋণ হিসেবে দিক। যা পরবর্তী আট থেকে ১০ বছরের মধ্যে সে তার বেতন থেকে পরিশোধ করতে পারবে। জাপানে কিন্তু লোকজন ১০/১২ লাখ টাকা খরচ করে যাচ্ছে, ওখানেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, ওখানেই ভাষা শিখছে। এই মডেল অনুসরণ করে লাখ লাখ তরুণকে বিদেশে পাঠাতে পারব। চীনে প্রচুর টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট আছে এখন। তারা শিক্ষার্থী চাচ্ছে কিন্তু তাদের জন্যে মাথাপিছু ৮/১০ লাখ টাকা খরচ করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে জমিজমা বিক্রি করে এই ৮/১০ লাখ টাকা খরচ করে তরুণরা সৌদি কিংবা মালয়েশিয়া যাচ্ছে খুব লো’পেইড বা কম আয়ের কাজের জন্যে। ওখানে কোনো স্কিল লাগে না। কিন্তু জাপান, কোরিয়া বা চীনে একই খরচে তরুণদের পাঠালে ওরা দক্ষ জনশক্তি হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
প্রশ্ন : সরকার এ ধরনের ঋণ দিলে তো অন্তত তা কুঋণে পরিণত হবে না, তরুণরা কাজ করে সহজেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে
ফাহিম মাশরুর : অবশ্যই। সরকারতো ৬০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে বড় বড় শিল্পপতিকে। এ ঋণের পুরোটাই কুঋণে পরিণত হবে। কিন্তু তরুণদের বিদেশে প্রশিক্ষণ ও কাজ পেতে ঋণ দিলে হয়ত এ ঋণের ১০ শতাংশ বড়জোর খেলাপি হতে পারে।
প্রশ্ন : ঋণ পেলে তরুণরা অবশ্যই শোধ করবে, তারা তো জমি জমা বিক্রি করে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর তা পরিশোধ করছে, আর সরকার ঋণ ফেরত না দেয়া পর্যন্ত দেশে ফেরার সুযোগের ক্ষেত্রে বা পাসপোর্ট জমা রাখার মত বাধ্যবাধকতা করতে পারে
ফাহিম মাশরুর : তরুণরা ঋণ পরিশোধ করবে তার সম্ভাবনাই শতভাগ। তারাতো কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাবে। অন্য দিকে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু সরকারের সার্বিক পলিসির মধ্যে অভিভাসন যে অর্থনীতির জন্যে একটা চালিকা শক্তি সেটার রিয়ালাইজেশনটাই নেই। ব্যাংকিং খাত বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক যাবতীয় পলিসি তৈরি করে শিল্পপতিদের জন্যে। যারা গত ১৫ বছর প্রকৃতপক্ষে টাকা চুরি করে পাচার করেছে। এবং ভবিষ্যতে আরো করবে।
প্রশ্ন : ওটা করেই তো গ্রামীণ অর্থনীতি মার খেয়েছে, গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ ছুটছে কাজের সন্ধানে শহরে, বেসরকারি খাতেও তো চাকরি তৈরি হচ্ছে না
ফাহিম মাশরুর : অর্থনীতির যে অবস্থা, অর্থমন্ত্রী নিজেই বলছেন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চার বছর সময় লাগবে। অনেকে ভেবেছিল নির্বাচনের পর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বিনিয়োগ কিন্তু এখনো হচ্ছে না। জ্বালানি সঙ্কট রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ দূরের কথা, স্থানীয়রাও বিনিয়োগ করছে না। আগামী এক দেড় বছরে কোনো দেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছি না।
প্রশ্ন : একটা সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কূটনীতি দরকার নয়কি
ফাহিম মাশরুর : কূটনীতি কিন্তু আছে। আমাদের তো চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ভাল সম্পর্ক। কূটনীতির সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে লোকাল পলিসির। উদ্যোগের জন্যে যে কর্মতৎপরতা, তহবিল যোগান প্রয়োজন, সে জন্যে কোনো গুরুত্ব বা রোডম্যাপ দেখিনা।
প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যে টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো তাহলে
ফাহিম মাশরুর : একটা সুপারিশও পড়ে দেখেনি। সরকারের লোকজন, আমলা বা নতুন সরকারের কেউ সেসব পড়ে দেখেনি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








