
- তাইম হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু
- ১১ আসামির ৯ জন পলাতক, কারাগারে ২
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় ইমাম হাসান তাইমকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছে। মামলার প্রথম দিনের যুক্তিতর্কে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো: ইকবাল হোসাইনের একটি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। ভিডিওতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মোবাইলফোনে একটি ভিডিও দেখানোর সময় ইকবাল হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না।’
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন ইকবাল হোসাইন। তা সত্ত্বেও হত্যাকাণ্ড বন্ধে তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি। তার ওই বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ইকবালের কথায় হত্যাকাণ্ড চলার বিষয়টি বোঝা যায়। অথচ তা বন্ধ করার জন্য তিনি কোনো চেষ্টা করেননি। ইকবালের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে যুক্তিতর্কে উল্লেখ করেন তিনি।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষে পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। এ সময় তার সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, মার্জিনা রায়হানসহ অন্য প্রসিকিউটররা। মামলার পটভূমি, তাইমকে হত্যার ঘটনা এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তারা। তবে প্রথম দিনে যুক্তিতর্ক শেষ না হওয়ায় বাকি বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
যুক্তিতর্কে তাইম হত্যার সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঘটনার সময় কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে কথাও বলেননি। এরপরও পুলিশ সদস্যরা তাইমকে গুলি করে। তাকে উদ্ধার করতে একজন এগিয়ে এলে ওই ব্যক্তিকেও গুলি করে পুলিশ। পরে প্রাণভয়ে ওই ব্যক্তি তাইমকে ফেলে দৌড়ে চলে যান।
ইকবাল হোসাইনের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছিল, সে বিষয়ে ইকবাল জানতেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মোবাইলফোনে ভিডিও দেখানোর সময় তার ‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না’ বক্তব্যটি এ মামলার যুক্তিতর্কে উপস্থাপন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি, ইকবালের এই বক্তব্য হত্যাকাণ্ড চলার বিষয়টি সম্পর্কে তার অবগতির প্রসঙ্গ সামনে আনে। কিন্তু হত্যাকাণ্ড বন্ধে তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করেন প্রসিকিউটর। তার বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেয়ার অভিযোগের পাশাপাশি ওই সময়ে তার ভূমিকা কী ছিল, তা মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
তবে ইকবালের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সাথে এর সম্পর্ক এবং এ থেকে তার দায় প্রতিষ্ঠিত হয় কি না, সেসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ও যুক্তিতর্ক এখনো বিচারাধীন; এগুলোকে ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ইমাম হাসান তাইমের বাবা মো: ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই)। তিনি রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজী নগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ওই আন্দোলনের সময় ২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তাইম।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, সেদিন কাজলা এলাকায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তাইমকে হত্যা করা হয়। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার বন্ধু রাহাতকেও পুলিশ গুলি করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাইম হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে গুলি চালানোর ঘটনা, হত্যার নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আসামিদের দায় নির্ধারণের জন্য ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে।
তাইম হত্যা মামলায় মোট আসামি ১১ জন। তাদের মধ্যে দু’জন কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান এবং সাবেক উপপরিদর্শক মো: শাহাদাত আলী। সোমবার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
অন্যদিকে, মামলার ৯ আসামি পলাতক। তারা হলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মো: ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপকমিশনার মো: মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মো: জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো: ওহিদুল হক এবং সাবেক উপপরিদর্শক সাজ্জাদ উজ জামান।
মামলার আসামিদের মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তাইমকে হত্যার ঘটনায় তাদের বিভিন্ন পর্যায়ের ভূমিকা ছিল। তবে কার কী ভূমিকা ছিল এবং কার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গত বছরের ২২ ডিসেম্বর দাখিল করা হয়। একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। এরপর ২৯ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীর ২৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে গত ১৫ জুন জবানবন্দী দেয়া শুরু করেন। পরদিন ১৬ জুন তার জবানবন্দী ও জেরা-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলে। আসামিপক্ষ ও স্টেট ডিফেন্সের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে যুক্তিতর্কের জন্য ১২ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়েছিল।
সোমবার সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম মামলার পটভূমি ও তাইমকে হত্যার ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। এ সময় ইকবাল হোসাইনের বক্তব্যসংবলিত ভিডিওও উপস্থাপন করা হয়।
প্রথম দিনের কার্যক্রমে যুক্তিতর্ক শেষ না হওয়ায় আগামী ২৫ অক্টোবর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন মামলার বাকি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে।
তাইম হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সময়ে মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








