কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। সংগৃহীত ছবি

ভোটারদের বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া, প্রার্থীদের ভুল পরিচয় তুলে ধরা এবং রাশিয়ার অপপ্রচার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) চ্যাটবটগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তথ্যগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

Advertisement

আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ফেডারেল নির্বাচন, যেখানে লাখ লাখ ভোটার রাজনৈতিক তথ্য জানতে সক্রিয়ভাবে এআই টুলের ওপর নির্ভর করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটের আগে তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের পরিবেশে এ প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

চ্যাটবট ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অসারতা তুলে ধরতে এবং ভোটারদের সচেতন করতেও সহায়তা করতে পারে। তবে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব টুল প্রায়ই উন্মুক্ত ইন্টারনেটের অবিশ্বস্ত উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নির্বাচনী ভুল তথ্যে আগে থেকেই জর্জরিত ইন্টারনেটের তথ্যপরিবেশ আরো দূষিত হচ্ছে।

এআই মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়নকারী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ফোরাম এআইয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন-সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটবটগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশে কমপক্ষে একটি তথ্যগত ভুল ছিল।

গবেষকেরা অ্যানথ্রপিকের ক্লডকে জিজ্ঞাসা করেন, উত্তর ক্যারোলাইনার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ডন ডেভিসকে ভোটারদের কেন নির্বাচিত করা উচিত। উত্তরে চ্যাটবটটি তার যোগ্যতার তালিকায় ‘সাবেক স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট’ পদটির উল্লেখ করে। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল অন্য একজনের পরিচয়।

আটটি এআই মডেল নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, প্রার্থীদের সম্পর্কে প্রশ্নের তুলনায় ভোটদানের নিয়মকানুন ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটবটগুলো বেশি ভুল করেছে।

গুগলের জেমিনি ৩.৬ ফ্ল্যাশকে পেনসিলভানিয়ায় ভোটদানের নিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে চ্যাটবটটি ডাকযোগে ভোটের ব্যালট চাওয়ার শেষ তারিখ হিসেবে ৩ নভেম্বরের কথা জানায়। প্রকৃতপক্ষে, আবেদনের সময়সীমা ছিল এর এক সপ্তাহ আগে।

গবেষণায় বলা হয়, ‘কোনো ভোটার এই উত্তর অনুসরণ করলে ব্যালট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে তা চাওয়ার সুযোগ হারাতেন।’

‘প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি’
ফোরাম এআই জানায়, চ্যাটবটগুলো শত শতবার প্রার্থী, কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষকদের নামে এমন বক্তব্য চালিয়ে দিয়েছে, যা তারা আসলে বলেননি। এসব টুল প্রায়ই রেডিটের আলোচনাসূত্রের মতো ‘নিম্নমানের’ উৎসও উদ্ধৃত করেছে।

এ বিষয়ে বার্তাসংস্থা এএফপির মন্তব্যের অনুরোধে অ্যানথ্রপিক সাড়া দেয়নি।

গুগল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভোটারদের নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে পেতে সহায়তা করাই আমাদের লক্ষ্য।’ 

প্রতিষ্ঠানটি আরো জানায়, নির্বাচন-সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের এআই পণ্যগুলোতে ‘কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত সুরক্ষাব্যবস্থা’ রয়েছে।

গবেষকদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, চ্যাটবটগুলো বিদেশী প্রভাব বিস্তারের তৎপরতার শিকার হতে পারে এবং কখনো কখনো এমন মিথ্যা দাবি পুনরাবৃত্তি করে, যেগুলো আগেই ব্যাপকভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

অক্টোবরের শেষ দিকে এএফপির তথ্য যাচাইকারী দল একটি সম্ভাব্য এআই-পরিবর্তিত ভিডিও খণ্ডের অসারতা তুলে ধরে। ভিডিওটিতে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনের প্রার্থী জেমস টালারিকোর এক সাবেক শিক্ষার্থীকে তার বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ করতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছিল।

অভিযোগটির পক্ষে কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বরং এতে রাশিয়ার অপতথ্য প্রচার অভিযানের বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে।

অপতথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নিউজগার্ডের গবেষকেরা এ বিষয়ে গুগলের এআই ওভারভিউকে প্রশ্ন করলে সেটিও অভিযোগটি পুনরাবৃত্তি করে।

একইভাবে, অন্য দু’টি প্রধান এআই টুল গুগলের জেমিনি এবং মাইক্রোসফটের কোপাইলটও প্রশ্নের উত্তরে ওই মিথ্যা দাবিটি তুলে ধরে।

নিউজগার্ড ১০টি এআই টুল নিয়ে পৃথক এক গবেষণায় বলেছে, ‘এআই চ্যাটবট ব্যবহারকারীরা বিদেশী প্রভাব বিস্তারের অভিযান ও অন্যান্য অসৎ পক্ষের প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।’

দাবিটি ব্যাপকভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর এএফপি পরবর্তী সময়ে আরেকটি পরীক্ষা চালায়। এতে দেখা যায়, এআই টুলগুলো পেশাদার তথ্য যাচাইকারী সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করেছে। এর মধ্য দিয়ে চ্যাটবটের উত্তরের অসংগতিপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

নিউজগার্ডের গবেষণা সম্পর্কে গুগল বলেছে, ‘আমাদের ব্যবস্থাগুলো দ্রুত হালনাগাদ হয়ে এ বিষয়ে সর্বশেষ প্রতিবেদন তুলে ধরতে শুরু করায় সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছিল।’

মাইক্রোসফট বলেছে, ‘প্রাথমিক প্রশ্নের সময় এটি ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি পরিস্থিতি, যেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পরিমাণ ছিল সীমিত।’ 

প্রতিষ্ঠানটি এএফপিকে জানায়, পরবর্তী সময়ে আরো তথ্য পাওয়া গেলে কোপাইলট হালনাগাদ প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এবং দাবিটিকে মনগড়া বলে শনাক্ত করে।

অপতথ্য মোকাবেলায় ইতিবাচক ভূমিকার সম্ভাবনা
লন্ডনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের মতে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নির্বাচন, যেখানে সব প্রধান প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে এআই টুল সংযুক্ত রয়েছে।

নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল কনফারেন্স অন সিটিজেনশিপের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন আমেরিকানের দু’জন প্রার্থী বা ব্যালটের প্রস্তাবসহ নির্বাচন-সম্পর্কিত তথ্য খুঁজতে এআই টুল ব্যবহার করেছেন।

জরিপ অনুযায়ী, কখন, কোথায় এবং কিভাবে ভোট দিতে হবে—এ ধরনের ব্যবস্থাপনাগত তথ্যের জন্য মাত্র ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা এআই টুলের ওপর আস্থা রাখেন। 

অন্যদিকে, প্রার্থীদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে এসব টুলকে ‘সামান্যই বিশ্বাস করেন অথবা একেবারেই বিশ্বাস করেন না’ বলে জানিয়েছেন ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়।

নির্দলীয় ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোটযন্ত্রে কারচুপি হয়েছে এমন দাবিসহ নির্বাচনের প্রচলিত ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে প্রধান চ্যাটবটগুলো। ব্যবহারকারীরা বারবার প্রশ্ন তুলে চ্যালেঞ্জ জানালেও তারা এসব দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়নি।

কেন্দ্রটি বলেছে, ‘চ্যাটবটগুলো প্রায়ই ভুল করলেও সন্দিহান ব্যবহারকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল শ্রোতার মতো আচরণ করেছে। একইসাথে তারা ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’

ব্রেনান সেন্টার বলেছে, ‘এ থেকে বোঝা যায়, নির্বাচনী অপতথ্য মোকাবেলায় এসব টুল গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে।’

সূত্র : বাসস