
কুমিল্লা ও প্রতিনিধি নাঙ্গলকোট সংবাদদাতা
পবিত্র ওমরাহ হজ পালন করতে গিয়ে হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় নাঙ্গলকোটের নিহত হাফেজ মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরের (৩৭) পরিবারে শোকের মাতম যেন থামছে না। গত রোববার বিকেল ৪টায় নাসরুল্লাহ বদরের মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে এসে পৌঁছে। এর আগে শনিবার দুপুরে সৌদি আরবের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মিসাইল হামলায় পর থেকে তার খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের মাঝে উদ্যোগ-উৎকন্ঠার মধ্যে রোববার বিকেলে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর আসে। নিহত নাসরুল্লাহ উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের ওলামা বাড়ির হাফেজ মোহাম্মদ উল্লাহর তৃতীয় ছেলে। তার আট বছর বয়সী ও চার বছর বয়সী দুই ছেলে এবং ছয় বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাসরুল্লাহর বড় ভাই মাওলানা আহসান উল্ল্যাহর সাথে যোগাযোগ রাখছেন বলে তিনি জানান। মাওলানা আহসান উল্ল্যাহ বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমার সাথে যোগাযোগ করলে আমি আমার ভাই নাসরুল্লাহর লাশ দেশে আমার বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করি। এ সময় তারা জানান, এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। লাশ কখন দেশে আনা হবে।
জানা যায়, গত শনিবার ভোরে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মুফতি মাওলানা নাসরুল্লাহ বদর ঢাকার কামরাঙ্গীরচর জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদরাসার শিক্ষক ও পরিচালক হিসেবে মাদরাসার শিক্ষকসহ ৪৫ জনের কাফেলা নিয়ে পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্য সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাদের বিমানটি রিয়াদ বিমানবন্দরে ট্রানজিট ছিল। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় বিমানটি অবতরণ করে। দুপুর আড়াইটার দিকে জেদ্দায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বোর্ডিং পাসের জন্য রিয়াদ বিমানবন্দরে তারা লাইনে দাঁড়ান। হঠাৎ ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এ সময় গুরুত্বর আহত হন মুফতি মাওলানা নাসরুল্লাহ বদরসহ আরো অনেকে। রোববার বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাসরুল্লাহর মৃত্যু হয়।
জানা যায়, ১০ বছর ধরে মুফতি মো: নাসরুল্লাহ বদর ঢাকার কামরাঙ্গীরচর জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলূম মাদরাসার শিক্ষক ও পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে কামরাঙ্গীরচর মাদরাসার পাশে বসাবাস করে আসছেন। তিনি ছুটিতে মাদরাসা বন্ধের সময় নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া বদরপুর নিজ গ্রামে পিতামাতাকে দেখতে আসতেন। তার মৃত্যুতে পিতামাতা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও ভাইসহ আতœীয়স্বজন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
এ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দেয়া পোস্টগুলো থেকে জানা যায়, শনিবার সকালে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী বিমানে চেপে স্বপ্নের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। বিমানে বসেই তিনি ইহরাম পরিহিত ছবি শেয়ার করে অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন। রিয়াদ বিমানবন্দরে নিরাপদে পৌঁছানোর পর ফেসবুকে একটি পোস্টে আলহামদুলিল্লাহ্ জানিয়ে সফর যেন নির্বিঘœ হয়, তার জন্য দোয়া চেয়েছিলেন।
নাসরুল্লাহর ভাই কুয়েত প্রবাসী মাওলানা আহসান উল্ল্যাহ বদর কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ভাই তাদের মাদরাসার শিক্ষক, কর্মচারী, বাবুর্চি ও দারোয়ানসহ ৪৫ জনের কাফেলা নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্য সৌদি এয়ারলাইনস করে সৌদিআরবে রওনা করেন। রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আমার ভাই তিনি বলেন মারা গেছে।
শনিবার রাত থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ সময় সৌদিআরবের বিভিন্ন হাসপাতালে তার খোঁজ নেই। রোববার বিকেল ৪টায় ঢাকার লালবাগের আল মক্কা ট্রাভেলস এজেন্সির মালিক বাংলাদেশ দুতাবাসের মাধ্যমে আমাকে আমার ভাইয়ের ডেথ সার্টিফিকেট প্রেরণ করেন। তার ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার পর আমরা তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হই। সে ইহরাম পরা অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছে। তার তিনটি এতিম সন্তান রয়েছে। তার লাশ দ্রুত দেশে প্রেরণসহ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য সৌদি সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তিনি জানান।
ছেলের মৃতুতে বাকরুদ্ধ নাসরুল্লাহর বাবা মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ। ছেলের মৃত্যুর খবর কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। ছেলের লাশ দেশে এনে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
এ দিকে একই দলের সাথে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন নাসরুল্লাহর চাচাতো ভাই দাউদুল ইসলাম। তিনিও ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। ছেলের আহত হওয়ার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তার বাবা মাওলানা মুহিবুল্লাহ। দাউদুলের শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সৌদি আরবে তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তার বাবা।
নাসরুল্লাহর লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু রায়হান জানান, লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








