মির্জাগঞ্জ থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া দরিদ্র পরিবারের সন্তান আরাফাত খান
মির্জাগঞ্জ থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া দরিদ্র পরিবারের সন্তান আরাফাত খান। নয়া দিগন্ত

এবারের এইচএসসি পরিক্ষায় পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া দরিদ্র পরিবারের সন্তান আরাফাত খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) পড়ার স্বপ্ন দেখছেন। জীবন যখন পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম বিভাবে সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে আলোর পথ দেখায়, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মো: আরাফাত খান।

Advertisement

এবারের এইচএসসি (বা সমমান) পরীক্ষায় মির্জাগঞ্জ উপজেলার আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজ থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার ছিল ৪৯ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।

তবে এই দুর্দান্ত সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক ও দীর্ঘ সংগ্রাম। আরাফাত খান মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাজিতা ৪র্থ খণ্ড গ্রামের মরহুম মো: ইসমাইল খানের ছেলে। আরাফাত যখন দশম শ্রেণির ছাত্র, ঠিক সেই সময়ই তার বাবা ইসমাইল খানের মৃত্যু হয়।

মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যাওয়ার পর পাঁচ সদস্যের পরিবারটিতে নেমে আসে সীমাহীন আর্থিক দুর্দশা ও অনিশ্চয়তা। বড় ভাই মো: আলামিন জন্ম থেকেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পরিবারের এই দুর্দিন ও সঙ্কটের মুহূর্তে হাল ধরেন আরাফাতের বড় বোন।

উচ্চশিক্ষা না থাকার কারণে ভালো কোনো চাকরি না পেলেও তিনি দমে যাননি। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে এবং ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা সচল রাখতে তিনি বেছে নেন পোশাক শ্রমিকের কঠিন কাজ।

বোনের সেই ঘাম ঝরানো আয় আর কষ্টার্জিত অর্থের ওপর ভর করেই এতদূর এগিয়ে এসেছেন আরাফাত। বর্তমানে বরিশালে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বাড়ি থেকে পাঠানো সামান্য টাকা আর দশম শ্রেণিতে পাওয়া সাধারণ বৃত্তির অর্থ দিয়েই কোনোমতো টেনেটুনে চলছে তার জীবনযাত্রা।

নিজের অদম্য জেদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আরাফাত খান বলেন, ‘বাবা হারানোর পর আমার বড় বোনের যে আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পোশাক শ্রমিকের কাজ করে তিনি আমাকে যেভাবে আগলে রেখেছেন, আজকের এই সাফল্য কেবল তারই। আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়া।’

উপজেলায় ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় একমাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত এই মেধাবী তরুণের এমন সাফল্যে এলাকাবাসী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গর্বিত। তবে আর্থিক অনটন আর অভাবের বেড়াজালে আরাফাতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন যেন থমকে না যায়, সে বিষয়ে সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

এবারে এইচএসসি পরিক্ষায় উপজেলার সাতটি কলেজে বিজ্ঞান, ব্যবসা ও মানবিক শাখায় ৮৫৯ পরিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছেন ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কাঠালতলী আকতার হোসেন মেমোরিয়াার ডিগ্রী কলেজ থেকে আরাফাত একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ-৫ পেয়েছে। 

আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজের (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ মো: মানিকুর রহমান ছিদ্দিক বলেন, ‘অত্যন্ত প্রতিকূল পারিবারিক পরিবেশ ও আর্থিক সঙ্কটকে জয় করে আরাফাত যে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে, তা আমাদের কলেজের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি এবং উচ্চশিক্ষার পথচলায় তাকে সাধ্যমতো সহায়তা করার চেষ্টা করব।’