
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিক দরপতনে আবার অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে পুঁজিবাজারে। গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে বড় ধরনের সূচক হারায় দেশের দুই পুঁজিবাজার। আর এর ফলে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৪০৪ পয়েন্টে। এটি বিগত সাড়ে মাসের মধ্যে পুঁজিবাজারটির প্রধান সূচকের সর্বনি¤œ অবস্থান। এ বছরের ১ জুনের পর বাজারটির সূচক আর এ পর্যায়ে নামেনি।
বরাবরের মতো গতকালও দিনের শুরুটা ভালোভাবেই পার করে দুই পুঁজিবাজার। কিন্তু লেনদেন শুরুর পনের মিনিটের মাধায় শুরু হয় বিক্রয়চাপ। মাঝখানে বেলা ১১টার পর সাময়িকভাবে পতন সামলে সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতে চাইলেও পরে বিক্রয়চাপের তীব্রতা তা ঘটতে দেয়নি। দুপুর ১২টার পর ফের তীব্র হয়ে ওঠে বিক্রয়চাপ। দিনের বাকি সময় বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সূচকের বড় পতন দিয়েই শেষ হয় দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন।
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৬ দশমিক ১৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৪৫১ দশমিক ০৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৫০৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়ার অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৯১ ও ৯ দশমিক ৬২ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৮৪ দশমিক ০২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩২ দশমিক ০৪ ও ৫৩ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল ডিএসইর লেনদেনেরও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। বাজারটি গতকাল ৪৫২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ১১৬ কোটি টাকা কম। এ ছাড়া গতকালের বাজারটির লেনদেন বিগত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ বছরের মার্চের পর আর এ পর্যায়ে নামেনি দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির লেনদেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে বাজার পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
এ দিকে দেশের শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেনের বড় পতনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিযোগ, বাজারের ধারাবাহিক দরপতন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান কমিশন। আগের কমিশনের সময়ে বাজারে দরপতন হলেও তা একটি সীমার মধ্যে ছিল বলে মনে করেন তারা। কিন্তু বর্তমান কমিশনের সময়ে বাজারে লাগাতার পতন ঘটলেও পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। কালেভদ্রে কোনো দিন সূচকের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও ফের ধারাবাহিক পতন ঘটছে বাজারের।
বিনিয়োগকারীদের ভাষ্য, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময়ে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের হারানো পুঁজি ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি কিছুটা মুনাফাও অর্জন করেন। বাজারকে আরো স্থিতিশীল করার প্রত্যাশায় সরকার আগের কমিশনের পরিবর্তে বর্তমান কমিশনকে দায়িত্ব দেয়। তবে নতুন কমিশনের কার্যক্রমে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ তাদের। বরং কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বাজার স্থিতিশীল হওয়ার পরিবর্তে ধারাবাহিক দরপতন হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমেছে এবং লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে। তারা মনে করেন কমিশন বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সত্য, কিন্তু তার সবই দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু প্রত্যাহিক বাজার ক্রমাগত খারাপ হতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের পুঁজির আদৌ অস্তিত্বই থাকবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারীর বাজারে টিকে থাকার সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। একমত পোষণ করে বাজার সংশ্লিষ্টরাও মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী দরপতন মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট আরো গভীর হবে। তখন বিনিয়োগকারীদের শূন্য পুঁজিতেই বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।
সোমবার ডিএসইতে মোট ৩৮৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এগুলোর মধ্যে ৪৭টি কোম্পানি ও ফান্ডে মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দরপতনের শিকার হয়েছে ৩০৩টি, যা মোট লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডের ৭৯ শতাংশ। দর অপরিবর্তিত ছিল ৩৫টির। একইভাবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৭৯টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ৩৭টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১২০টি। এখানে দর অপরিবর্তিত ছিল দুইটি সিকিউরিটিজের।
ঢাকা স্টকে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি ইভিন্স টেক্সটাইলস। এদিন ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১ কোটি ১৩ লাখ ৫৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ৬৭ লাখ ৪২ হাজার শেয়ারা বেচাকেনা করে বেক্সিমকো লিমিটেড ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনালী আঁশ, সায়হাম টেক্সটাইলস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, আইপিডিসি ফিন্যান্স, ব্র্যাক ব্যাংক, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং ও এম এল ডাইং।
গতকাল ডিএসইতে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি কোনো কোম্পানি বা ফান্ডের। ৪ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার প্রথমে ছিল টেক্সটাইল কোম্পানি এমএল ডাইং। ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ দর বেড়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং। মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারটির শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আরামিট লিমিটেড, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, জিকিউ বলপেন, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, নাভানা ফার্মা ও নাহি অ্যালুমিনিয়াম।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








