ইরান যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প-পুতিন আলোচনা

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আলোচনার সময়  ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের শর্ত ও অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্টভøাদিমির পুতিন। শুক্রবার ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মিডলইস্ট আই এবং আলজাজিরা শুক্রবার জানায়,  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। ইরান সঙ্কট সমাধানের প্রচেষ্টায় রাশিয়ার সম্পৃক্ত হওয়াকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাগত জানিয়েছেন বলেও জানিয়েছে ক্রেমলিন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর প্রকাশ করেছে। রুশ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ইরানের প্রেসিডেন্টের সাথে সমন্বয় করে পুতিন সঙ্ঘাতের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ইরানের অবস্থান ট্রাম্পকে জানিয়েছেন।
পেসকভ বলেন, ইরানের প্রেসিডেন্টের সাথে সমন্বয় করে পুতিন সংঘাতের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে ইরান পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন।  তবে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধে ঠিক কী কী শর্ত দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ক্রেমলিনের বক্তব্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি। একইভাবে পুতিনের মাধ্যমে তেহরানের অবস্থান জানানোর পর ট্রাম্প কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তা-ও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার খবরের পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি নিয়েও নতুন সমঝোতার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। শুক্রবার তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে তার এমন একটি চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় আগামী কয়েক মাসে রাশিয়া ১০ লাখ টনের বেশি ডিজেল রফতানি করতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা সত্ত্বেও এ রফতানির সুযোগ দেয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার দাবি, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যেই তিনি এ সমঝোতা করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহনব্যবস্থায় বিঘেœর কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ডিজেল রফতানির সুযোগ বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তবে রাশিয়ার ডিজেল রফতানির এ সমঝোতা জ্বালানির দাম কতটা কমাতে পারবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এর প্রভাব নির্ভর করবে রফতানির প্রকৃত পরিমাণ, সরবরাহের সময়সূচি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।
কূটনৈতিক তৎপরতা
পুতিনের মাধ্যমে ইরানের অবস্থান ট্রাম্পের কাছে পৌঁছানোর ঘটনা চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এ যোগাযোগ থেকে যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী সমঝোতার কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। ইরানের শর্তগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং সম্ভাব্য আলোচনার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে মস্কো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ফলে পুতিনের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতার পথ কতটা এগোবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। এক দিকে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের অবস্থান নিয়ে আলোচনা, অন্য দিকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা- দু’টি ঘটনাই চলমান সংঘাতের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানিবাজারে সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে। 
দুই যুদ্ধের সমাধান নিয়ে আশাবাদ
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, উভয় সংঘাতের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া ‘দ্রুতগতিতে’ এগোচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক কিংবা সামরিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে- দুই যুদ্ধেরই অবসান ঘটাতে চান তিনি। তবে ট্রাম্পের এ আশাবাদ সত্ত্বেও যুদ্ধ দুটি শেষ করার বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে- এমন তথ্য তার বক্তব্যে উঠে আসেনি। ফলে তার মন্তব্যকে যুদ্ধের অবসানসংক্রান্ত প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়ে নিজের ভূমিকা তুলে ধরে ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন, তিনি আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে যুদ্ধ দু’টি নিয়ে তার সর্বশেষ মন্তব্যের পরও কবে নাগাদ এবং কী শর্তে সংঘাতের অবসান ঘটবে, তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। 
জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য ট্রাম্পই দায়ী
জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম এবং রুশ ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ডেমোক্র্যাটরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যদের এক্স অ্যাকাউন্টে দেয়া এক পোস্টে কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়ার জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, তার বিপর্যয়কর ইরান যুদ্ধ গ্যাস ও ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী করেছে এবং আমেরিকানরা এর মূল্য দিচ্ছেন।
শুক্রবার ট্রাম্পের রুশ জ্বালানি কেনার ঘোষণারও সমালোচনা করেন মিকস। তার ভাষ্য, রুশ জ্বালানির ক্রেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনে প্রেসিডেন্ট সই করার কয়েক সপ্তাহের মাথায় এ ঘোষণা এল। মিকস বলেন, আমি এ নীতি উল্টে ফেলার নিন্দা জানাই। ইউক্রেনে আগ্রাসনের জন্য পুতিনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির বদলে ট্রাম্প তাকে তোষণ করেই যাচ্ছেন।
হামলা মোকাবেলায় প্রস্তুত ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না বলে মন্তব্য করলেও নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। দেশটির সামরিক বাহিনী নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা করছে এবং আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও সংঘাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে। ইরানি সংবাদপত্র আল-ওয়েফাকের প্রধান সম্পাদক মোখতার হাদ্দাদ আলজাজিরাকে এ কথা জানিয়েছেন। হাদ্দাদ বলেন, তেহরান ও ইরানের অন্যান্য শহরে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা এবং সামরিক মহড়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে নিজেদের হিসাবনিকাশ করছে না। ট্রাম্পের বক্তব্যের বিষয়ে ইরানের আস্থা কম বলেও জানান তিনি।
হাদ্দাদের ভাষ্য, ইরানের সরকার ও সামরিক বাহিনী ট্রাম্পের নির্বাচনী বক্তব্যকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময় নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারেন। অতীতেও আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে থাকাকালে তিনি তা ভেঙে দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন হাদ্দাদ। তিনি আরো বলেন, আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধ ও চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে ইরান। দুই দেশের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও ট্রাম্পের আচরণের কারণে তা সাময়িক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাদ্দাদ বলেন, স্বল্প মেয়াদে নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ ও চাপ মোকাবেলার প্রস্তুতিও জোরদার করছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ভয় পায় না ইরান : পেজেশকিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ইরানের জনগণ ভীত নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, ইরানের জনগণ যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন বীরত্বপূর্ণ দেশের গর্বিত মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। তেহরানে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ ও যাযাবর জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা প্রদর্শনীতে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন।
সমঝোতার আহ্বান মার্কিন কংগ্রেসম্যানের
এ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পেঁৗঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ। তার মতে, সাত মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চললেও ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে স্মিথ বলেন, যুদ্ধের সাত মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন তার কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। তিনি আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাস্তবতা উপলব্ধি করার এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের স্বার্থে কোন বিকল্পগুলো সবচেয়ে কার্যকর, তা মূল্যায়ন করার সময় অনেক আগেই এসেছে।
স্মিথের মতে, ২০১৫ সালে ইরানের সাথে ছয় বিশ্ব শক্তির স্বাক্ষরিত যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার (জেসিপিওএ) মতো একটি চুক্তিই এ যুদ্ধের যৌক্তিক পরিণতি হতে পারে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা।