
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ‘আম-কূটনীতি’র কার্যকারিতা এখন তার শেষ সীমায় পৌঁছেছে। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সম্পর্ককে পুরোপুরি ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছে ঠিকই, গত দুই বছর ধরে নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক যাতে স্থায়ী শীতলতায় বা বিচ্ছিন্নতায় পর্যবসিত না হয়, সে জন্য ঢাকা ‘নরম কূটনীতি’র আশ্রয় নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হাঁড়িভাঙ্গা আম, ইলিশ মাছ, জামদানি কাপড় এবং টাঙ্গাইল শাড়ির মতো বিষয়গুলোকে। এই পদক্ষেপগুলো আলোচনার পথ খোলা রেখেছে, জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং সাময়িক মতপার্থক্যকে চরম শত্রুতায় রূপ নেয়া থেকে বিরত রেখেছে।
তবে পরিস্থিতির ধুলো থিতিয়ে আসার পর ভূ-রাজনীতির এক কঠোর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘নরম শক্তি’ বা ‘সফট পাওয়ার’ হয়তো আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে; কিন্তু এর আড়ালে থাকা জটিল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এটি দিতে পারে না। টানাপড়েনপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন এক অনিবার্য মুহূর্ত আসে, যখন আম বা এ ধরনের উপহারের ভূমিকা আর কার্যকর থাকে না।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বস্ত্র প্রদর্শনী, ইলিশ উৎসব এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতীয় প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রচেষ্টা চালিয়েছে- এমনকি যখন উভয় সরকারের মধ্যে একে-অপরের প্রতি বলার মতো খুব একটা ইতিবাচক কিছু ছিল না, তখনো। এই প্রচেষ্টা বা প্রচারণার বিষয়টি যে পুরোপুরি অর্থহীন ছিল, তা নয়। তবে শেষ পর্যন্ত এর ওপর যে রাজনৈতিক ভার বা প্রত্যাশা চাপানো হয়েছিল, তা বহন করার সক্ষমতা এর ছিল না।
এক ঝুড়ি আম হয়তো সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলিয়ে দিতে পারে। শাড়ির প্রদর্শনী হয়তো কোনো বিশাল হলঘরকে মুগ্ধ দর্শকে পূর্ণ করে তুলতে পারে। কিংবা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত ও সুস্বাদু ইলিশের চালান কলকাতায় হয়তো গভীর নস্টালজিয়া বা আবেগের উষ্ণতা জাগিয়ে তুলতে পারে; কিন্তু এসবের কোনোটিই শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ মেটাতে পারে না, ভেঙে যাওয়া রাজনৈতিক আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে না কিংবা নিবিড়ভাবে জড়িত দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মূল উদ্বেগগুলোর সমাধান করতে পারে না।
হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও পরবর্তী সময়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে তীব্র তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা সত্ত্বেও ঢাকা যে স্বাভাবিক ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী- আম কূটনীতির পদক্ষেপটিকে তার একটি সুচিন্তিত বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল। আমগুলো যথাসময়ে দ্রুত পৌঁছে গেলেও, জটিল রাজনৈতিক সমস্যাগুলো কিন্তু আগের জায়গাতেই রয়ে গিয়েছিল।
হাসিনা ভারতেই অবস্থান করতে থাকেন, আর ঢাকার কর্তৃপক্ষ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার (প্রত্যর্পণ) প্রক্রিয়া চালাতে থাকে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট সুবিধা এবং বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে দুই রাজধানীর মধ্যে ক্রমাগত মতভেদ চলতে থাকে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উষ্ণতার অন্যতম সূচক হিসেবে পরিচিত ভিসা পরিষেবা একপর্যায়ে স্থগিত করা হয়েছিল; তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তা পুনরায় চালু হয়; কিন্তু ভিসা প্রদানের সংখ্যা এখনো ২০২৪-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসেনি।
যৌথ পানিসম্পদ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো কোনো সুরাহা ছাড়াই ঝুলে থাকে। ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’ বা নমনীয় কূটনীতি বড়জোর মূল আলোচনার বাইরে একধরনের মনোরম অনুষঙ্গ হিসেবেই কাজ করেছিল, কোনো প্রধান বিষয় হয়ে ওঠেনি।
নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের বিদায়ী দূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর চেয়ে দৃশ্যমানভাবে এই নমনীয় কৌশল আর কেউ অনুসরণ করেননি। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ হাইকমিশন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে আয়োজিত প্রথম জামদানি প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পকে ভারতের এমন এক শৈল্পিক পরিসরে তুলে ধরে, যেখানে উভয় দেশের অভিন্ন ইতিহাসের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে মিশনটি আরেকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে, যেখানে টাঙ্গাইল ও পাবনার দক্ষ তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা ৩০০টি তাঁতের শাড়ি উপস্থাপন করা হয়। ভারতীয় রাজধানীর পক্ষ থেকে এতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়।
সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি সফল হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক ভারতীয় শিল্পরসিক প্রদর্শনীতে ভিড় জমান, ডিজাইনাররা একে অপরের সাথে মতবিনিময় করেন এবং মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সব শাড়ি বিক্রি হয়ে যায়। অভিন্ন নদী বা পানিসম্পদ নিয়ে আলোচনার চেয়ে অভিন্ন বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা যে অনেক বেশি সহজ, তা-ই যেন এতে প্রমাণিত হলো। এই কৌশলের পেছনে একটি যৌক্তিক কারণ ছিল : ভারতীয় সমাজের এমন কিছু অংশ বা গোষ্ঠী গড়ে তোলা যারা বাংলাদেশকে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত না- এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বাফার’ বা সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করত।
কূটনৈতিক ভুলটি হয়েছে ‘প্রবেশাধিকার’ এবং ‘প্রকৃত প্রভাব’-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারার কারণে। একটি বস্ত্র প্রদর্শনীতে সব পণ্য বিক্রি হয়ে যাওয়াটা বাংলাদেশী কারুশিল্পের প্রতি ভারতীয়দের প্রশংসারই প্রমাণ; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তারা ঢাকার কৌশলগত অবস্থানের সাথেও একমত। দক্ষিণ এশিয়ায় সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা কখনোই রাজনৈতিক মতৈক্যের নিশ্চয়তা দেয়নি।
তা যদি হতো, তবে ইলিশ-ভোজকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যকার সব দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য বহু আগেই মিটে যেত। বস্তুত এমনকি বস্ত্রশিল্পের বিষয়টিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েছিল; টাঙ্গাইল শাড়ি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতির দাবি নিয়ে বিতর্ক এর প্রমাণ।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ-এর কার্যকারিতারও একটা সীমা থাকে। আজ হোক বা কাল, আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই মূল বিষয়গুলোর সুরাহা করতে হয়। তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের আয়োজন নিয়ে চলমান প্রচেষ্টাগুলোই এই পরিবর্তনের বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলে। ভারত তাকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফর এবং বিমসটেক-এর চেয়ার হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেয়ার- উভয় আমন্ত্রণই জানিয়েছিল।
তবে রহমান সেই সফরে যাননি। ঢাকা জানিয়েছিল যে, উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রয়োজন; অন্য দিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন যে, আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সফরটি বাস্তবায়িত হয়নি।
এই ভদ্রোচিত অচলাবস্থা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রটিই উন্মোচন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি, সতর্ক রাজনৈতিক প্রস্তুতি এবং এমন সব দৃশ্যমান ফলাফল যা উভয় নেতাই নিজ দেশের জনগণের কাছে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে পারেন। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বারবার শীর্ষপর্যায়ে সরাসরি আলোচনার তাগিদ দিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অপরিহার্য।
‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’ বা নমনীয় কূটনীতি তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন এর অন্তর্নিহিত কৌশলগত ভিত্তিটি আগে থেকেই কার্যকর থাকে। যখন দু’টি সরকার মৌলিক বিষয়গুলোতে একমত হয়, তখন সাংস্কৃতিক নৈকট্য সেই সম্পর্কে উষ্ণতা ও প্রাণবন্ততা যোগ করে; কিন্তু মৌলিক স্বার্থের প্রশ্নে যখন সঙ্ঘাত বাধে, তখন ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় শক্তি সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়া ঠেকাতে পারলেও, সমঝোতার শর্তাবলি নির্ধারণ করতে পারে না।
ঢাকার সাথে ভারতের পূর্ববর্তী সম্পর্কটি গড়ে উঠেছিল গভীর নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি সংযোগ এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি সেই স্বস্তিদায়ক কাঠামোটিকে ভেঙে দিয়েছে।
ঢাকার বর্তমান নেতৃত্ব এখন সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিকতা এবং কৌশলগত নমনীয়তার ওপর ভিত্তি করে সম্পর্কের এক নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে। অন্য দিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ঢাকার পরিবর্তিত বৈদেশিক সম্পর্কের বিন্যাস নিয়ে নয়াদিল্লির নিজস্ব গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এগুলো অত্যন্ত জটিল বিষয়, যার সাথে বাণিজ্য চুক্তি, পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো জড়িত। সাংস্কৃতিক দূতদের মাধ্যমে বা নৈশভোজের আলোচনার টেবিলে বসে এগুলোর সমাধান করা সম্ভব নয়।
গত দুই বছরে নেয়া পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ ছিল না; বরং রাজনৈতিক পালাবদলের উত্তাল সময়ে সেগুলো সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় পরিসরটুকু টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু প্রতীকী উদ্যোগের কার্যকারিতা বা সুফল এখন ক্রমশ কমে আসছে। উভয় রাজধানীই বোঝে যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়টি কেবল কোনো কাপড় বা ফল নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার ক্ষেত্রে আমগুলো সফল ভূমিকা রেখেছে; এখন সেই পথ ধরেই প্রকৃত রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








