অর্থনৈতিক চাপ কাটাতে সুশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছায় জোর সিআইপিজির

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ থেকে উত্তরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (সিআইপিজি)। প্রতিষ্ঠানটির মতে, দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট কোনো একক সমস্যার ফল নয়; বরং মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কৃষিজমির সঙ্কোচন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে অর্থনীতির ওপর সম্মিলিত চাপ তৈরি করছে।
গতকাল প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের এক নীতি-পর্যালোচনায় সিআইপিজি বলেছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোকে যুক্ত করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেছে। একইসাথে অর্থনৈতিক সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ
সিআইপিজির মূল্যায়নে, সাধারণ মানুষের কাছে  অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, পরিবহন ও শিক্ষার ব্যয় আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়ে।
প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজারে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুদদারি নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের তাগিদ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম শর্ত হিসেবে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে সিআইপিজি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ, প্রভাবশালী পক্ষকে ঋণ দেয়ার প্রবণতা এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে এর দায় শেষ পর্যন্ত আমানতকারী, করদাতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পেশাগত স্বাধীনতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যর্থতার মধ্যে পার্থক্য করে আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
সিআইপিজির নীতি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তার প্রকৃত সুফল মূল্যায়নের ঘাটতিও সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করে। এ জন্য বড় সরকারি প্রকল্পে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ফলাফল মূল্যায়ন বাধ্যতামূলকভাবে শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
দুর্নীতি দমনে সমান আইনের প্রয়োগ
সিআইপিজির মতে, দুর্নীতি শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ায়, সেবার মান কমায়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারকে শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিমাপযোগ্য কর্মসম্পাদন সূচকে রূপ দেয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের প্রস্তাব
বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সিআইপিজি। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সীমিত ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনসংখ্যার চাপ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, আবাসন, পরিবহন ও কর্মসংস্থানে বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি করছে। তবে উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কর্মবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে।
কৃষিজমি সুরক্ষা ও আধুনিক কৃষি
নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন এবং সড়ক নির্মাণের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে বলে নীতি-পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইপিজির মতে, কৃষিজমির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ঝুঁকি মোকাবেলায় কৃষিজমি সুরক্ষার পাশাপাশি উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, স্মার্ট সেচ, জীবপ্রযুক্তি, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংস্কারের কেন্দ্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা
সিআইপিজির মূল্যায়নে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর বড় অংশ ইতোমধ্যে চিহ্নিত। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার সমস্যার মূল উৎসে হাত দেয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সাহস দেখাতে পারবে কি না।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কার্যকর সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠী, দুর্নীতির নেটওয়ার্ক, বাজার কারসাজি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং প্রশাসনিক অনিয়ম মোকাবেলা করতে হতে পারে। তাই সরকারের সাফল্য শুধু ঘোষিত পরিকল্পনা দিয়ে বিচার না করে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
১০ দফা সুপারিশ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সিআইপিজির সুপারিশগুলো হলো- ১. তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন কর্মসূচি গ্রহণ। ২. খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি এবং মুদ্রানীতি-রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ৩. খেলাপি ঋণ, প্রভাবিত ঋণ বিতরণ ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা মোকাবেলায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। ৪. রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের প্রভাবমুক্ত দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত ও বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ৫. বড় সরকারি প্রকল্পে স্বাধীন সম্ভাব্যতা যাচাই, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা ও ফলাফল মূল্যায়ন।
 ৬. কৃষিজমির নির্বিচার ব্যবহার পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির সম্প্রসারণ। ৭. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল দক্ষতার মাধ্যমে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর। ৮. ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, স্টার্টআপ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা সহজ করা। ৯. বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পেশাগত স্বাধীনতা ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ১০. দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা।
আস্থার পুনরুদ্ধারই টেকসই উন্নয়নের শর্ত
সিআইপিজি মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা। আমানতকারীর ব্যাংকের প্রতি, ব্যবসায়ীর নীতির প্রতি এবং বিনিয়োগকারীর দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, কৃষিভিত্তি, তৈরি পোশাকসহ প্রতিষ্ঠিত রফতানি খাত, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তিতে আগ্রহী তরুণ সমাজ। এসব শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিআইপিজির মূল বক্তব্য হলো, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কেবল সরকারি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত করতে হবে। দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দিয়ে সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ তৈরি হতে পারে।